BRAKING NEWS

জঙ্গলমহলে জাতিসত্ত্বার আন্দোলন অন্ধকারের ভিতরেও আলোর দিশা

মধুসূদন মাহাতো: জঙ্গলমহলে জনগোষ্ঠীগুলির জাতিসত্ত্বার আন্দোলনে সাম্প্রতিক বেশ কিছু প্রগতিশীল ইতিবাচক দিকও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যাকে অবশ্যই বিষয়ভিত্তিক নৈতিক সমর্থন এবং সাধুবাদ জানাতে হয়। জঙ্গলমহলের জনগোষ্ঠীগুলির এতকালের জাতিসত্ত্বার আন্দোলন ছিল মূলত জাত, ধর্ম, ভাষা কেন্দ্রিক। অবশ্য এখনও সেই ধারাই বজায় রয়েছে। এই আন্দোলনের ফলে জনগোষ্ঠী গুলির নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে।

বৈরিতা সৃষ্টি হতে হতে মেরুকরণের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। আদিবাসী স্বীকৃতির দাবি, আদিবাসী স্বীকৃতি হতে না দেওয়ার দাবি জঙ্গলমহলের জনগোষ্ঠীগুলির মধ্যে ব্যাপক চাপান-উতর চলছে। শাসক তার ভোট ব্যাংকের দিকে লক্ষ্য রেখে জাহের থানে এবং গরাম থানে সরকারি অর্থ বরাদ্দ করে মেরুকরণকে আরো ত্বরান্বিত করেছে। সামাজিক সংগঠনগুলির সভা সমাবেশের মঞ্চগুলিতে পরস্পর পরস্পরের দিকে আঙ্গুল তুলে তীব্র ভাষায় গালাগালি দেওয়া শুরু হয়েছে। যুগ যুগ ধরে পাশাপাশিভাবে বসবাস করে আসা সৌভ্রাতৃত্বের  বাতাবরণে চিড় ধরেছে।

সামাজিক মাধ্যমগুলিতে গোষ্ঠীগুলির উঠতি সমাজকর্মীদের বাদানুবাদ অনবরত পরিবেশ তিক্ত করে চলেছে। অহরহ বিদ্বেষ, ঘৃণা ছড়িয়ে পুরো জঙ্গলমহলকে কলুষিত করে চলেছে । যা জঙ্গলমহলে কশ্মিনকালেও ছিল না। এমনটা চলতে থাকলে দাঙ্গা বা গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি যে তৈরি হবে না তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।

তারপরেও এই জনগোষ্ঠীগুলির আন্দোলনের ভেতরে কিছু প্রগতিশীল ইতিবাচক দিক লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সুখের খবর যে, জনগোষ্ঠীগুলির কর্মসূচিতে সম্প্রতি আপামর জনগণ অর্থাৎ জঙ্গলমহলের সংখ্যাগরিষ্ঠ গরিব মানুষের জীবন জীবিকার কথা উঠে আসছে। মানুষের হাতে কাজ দেওয়ার দাবি, ১০০ দিনের কাজ চালু করার দাবি, কৃষকের ধানের নাহ্য দাম বাড়ানোর দাবি, সব মানুষের কাছ থেকে ধান কেনার দাবি, সার কীটনাশকের দাম কমানোর দাবি ইত্যাদি। দাবিগুলি জাত-পাত, ধর্ম নির্বিশেষে আপামর গরিব মানুষের জীবনের কথা। জঙ্গলমহলের শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণই ভেঙে পড়েছে। উৎসশ্রীর কল্যাণে শহুরে শিক্ষকরা জঙ্গলমহল থেকে শহরের দিকেই পালিয়ে গেছে। জঙ্গলমহলের বহু স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। বহু স্কুল একজন শিক্ষক নিয়ে কোনক্রমে বেঁচে আছে।

হোস্টেলগুলো প্রায় সব বন্ধ হয়ে গেছে। বিদ্যালয়েরগুলিতে স্কুল-ছুটএর সংখ্যা বেড়ে গেছে।  জঙ্গলমহলে শিক্ষার এই দুরবস্থার সময়ে ধীরে হলেও সমাজ আন্দোলনের নেতৃত্বদের সরব হতে দেখা যাচ্ছে। ভোটের টোপ হিসাবে জঙ্গলমহলের মানুষের মধ্যে শাসকের ধামসা মাদল শাড়ি বিলি তেমন আর সাড়া ফেলছে না। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের জঙ্গলমহল উৎসবগুলির মধ্যে কোন প্রাণ নেই, এখন শুধুই কৃত্রিমতা।

স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডাক্তার নিয়োগের দাবি, স্কুল চালু রাখা, হোস্টেল খোলা, ল্যাম্পসগুলিকে সচল করা ইত্যাদি দাবিগুলি জঙ্গলমহলের মানুষের কাছে প্রগতিশীলতারই পরিচায়ক। যদিও মানুষের মৌলিক দাবিগুলি সম্পর্কে জনগোষ্ঠীগুলির মধ্যে এখনও যথেষ্ট দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে।

আরো যেটা ভবিষ্যতের পক্ষে ইতিবাচক তাহলো, এই সময়কালে জঙ্গলমহলের জনগোষ্ঠীগুলির তীব্র মনুবাদ-ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরোধিতা। দীর্ঘদিন ধরে ব্রাহ্মণ্যবাদে প্রভাবাম্বিত বেশ কিছু জনগোষ্ঠী নিজেদের জাতিসত্ত্বার তাগিদেই ব্রাহ্মণ্যবাদের খোলস থেকে নিজেদের মুক্ত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মূর্তিপূজার বিরোধিতা, মন্ত্র-তন্ত্রকে অস্বীকার, সামাজিক অনুষ্ঠানগুলিতে পুরোহিত বর্জন ইত্যাদি প্রক্রিয়াগুলি যথেষ্ট প্রগতিশীলতারই পরিচায়ক। ভারতবর্ষে ব্রাহ্মণ্যবাদ যদি কোথাও চরমভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে তা এই জঙ্গলমহলে জনগোষ্ঠীগুলির কাছেই। যদিও হলফ করে বলা যাবে না যে জঙ্গলমহলের জনগোষ্ঠীরগুলির নেতৃত্বরা সকলেই কায়মনোচিত্তে কুসংস্কার-অন্ধবিশ্বাস মুক্ত এবং যুক্তিবাদী মুক্তচিন্তার অধিকারী! কিন্তু জঙ্গলমহলের জনগোষ্ঠীগুলির সারি কিংবা সারনা ধর্মের অনুসারীরা তথাকথিত হিন্দু ধর্মের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে। তাই মন্দের ভালো হিসাবে ব্রাহ্মণ্যবাদের সামনে একদিন বৌদ্ধধর্ম যেভাবে চ্যালেঞ্জ আকারে হাজির হয়েছিল ঠিক তেমনি ভাবেই হিন্দু ধর্মের কাছে সারি এবং সারনা ধর্ম এখন গলার কাঁটা।

আমার ধারণা জঙ্গলমহলে এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জনগোষ্ঠীগুলির তীব্র জাতিসত্ত্বার আন্দোলনের কারণে কেন্দ্রের হিন্দু পুনরুত্থানবাদী দলের সরকার ভারতে আদমশুমারি করে জনগণনা করতে ভয় পাচ্ছে। কারণ জনগণনা করলেই ধর্মের কলামে এখন জনগোষ্ঠীগুলি তাদের নিজস্ব ধর্ম সারি কিংবা সারনা ধর্ম লিপিবদ্ধ করিয়ে নেবে। জনগণনার ধর্মীয় কলামে তাদের ধর্ম উল্লেখ করার মতো জায়গা না থাকলে নতুন করে আন্দোলন সৃষ্টির সম্ভবনাও রয়েছে। ফলে এতদিন ধরে যে জনগোষ্ঠীগুলিকে সরকারিভাবে হিন্দু ধর্মেরই অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছিল এবং হিন্দু ধর্মের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত করে রাখা হয়েছিল সেটা এখন আর সম্ভব হবে না। ফলতই ভারতবর্ষের জনগণনা করা হলে সরকারী হিসাবে এক লহমায় কয়েক কোটি হিন্দু জনসংখ্যা কমে যাবে। আর এটা হলে দেশে একটা হিন্দু পুনরুত্থানবাদী দল কেন্দ্রের সরকারের আসীন হওয়ার পরেও ভারতবর্ষে হিন্দু জনসংখ্যা কমে গেলে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরেও তার বেশ প্রভাব পড়বে। অতএব কে চায়, নিজের গা চুলকে ঘা করে নিতে! স্বাভাবিকভাবেই আদমশুমারি করার সময় দু বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও কেন্দ্রীয় সরকার জনগণনা করার মোটেই উদ্যোগ নিতে চাইছে না।

পরিশেষে আরও একটি বিষয় উল্লেখ করার মতো তা হলো, জঙ্গলমহলে সম্প্রতি কিছু জনগোষ্ঠী মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন হিসেবে মে দিবসের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিনকে বেছে নিয়েছে। জঙ্গলমহলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই যেহেতু শ্রমজীবী তাই এই দিনটিকে বেছে নেওয়া বেশ তাৎপর্য বহন করে। জনগোষ্ঠীগুলি যদি এই এই দিনটির তাৎপর্য যথাযথভাবে উপলব্ধি করে জঙ্গলমহলের মানুষকে সচেতন করতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে এই জনগোষ্ঠীগুলিই আপামর গরিব মানুষের মুক্তির দূত বনে যেতে পারে। তবে জঙ্গলমহলে আপামর গরিব মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এই জনগোষ্ঠীগুলি কতদূর টেনে নিয়ে যাবে এবং জঙ্গলমহলের মানুষের মৌলিক সমস্যার সমাধানে কতটা কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে, সেটা সময় বলবে।

Leave a Reply