ঝাড়ুর কাছে ঝাঁটা পেটা পদ্ম ফুল, ধর্ম নয় উন্নয়নেই ভরসা দিল্লির

11 February 2020, 6:06 pm, 556 Views

ধর্মীয় বিভিন্ন মেরুকরণের মোড়কে কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের মাধ্যমে মানুষের মন জয়ের চেষ্টা অভিযোগ বারে বারেই উঠেছে নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে। সেই চেষ্টা রাজধানী নয়াদিল্লিতে কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে। নয়াদিল্লির বিধানসভার নির্বাচনে এবার দুটি বিষয় মোটাদাগে হাজির হয়েছিল; ধর্ম না উন্নয়ন? এই প্রশ্নে দ্বিতীয় বিকল্পকেই বেছে নিয়েছে দিল্লি।

টানা তৃতীয়বারের মতো দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর মসনদে বসতে চলেছেন আম আদমি পার্টির (আপ) নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল। ২০১৫ সালের নির্বাচনের (৬৭টি আসনে আপের জয়) চেয়ে এবার আসন (৬৩ আসনে আপের জয়) কিছুটা কমলেও বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসছে আম আদমি পার্টি (আপ)।

বিজেপির আসন বাড়লেও এবারও ধর্মীয় মেরুকরণ, সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ), জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি), জাতীয় জনসংখ্যা রেজিস্টারের (এনপিআর) ধাক্কায় দিল্লির মসনদ অধরাই থেকে গেল বিজেপির কাছে। অন্যদিকে, কার্যত ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল কংগ্রেস।

গত শনিবার নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষে বুথ ফেরত সমীক্ষায় কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টির ভূমিধস জয়ের আভাষ মিলছিল। মঙ্গলবার সকালে ভোট গণনার জন্য ইভিএম (ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন) খোলা শুরু হয়। প্রাথমিক ফলাফলে দিল্লির ৭০ আসনের মধ্যে ৬৩টিতে আপ, বিজেপি ৭টি আসনে জয় পেয়েছে। ভরাডুবির মধ্যে বিজেপির কাছে একমাত্র সান্ত্বনা, গতবার মাত্র ৩টি আসন পেলেও এবার তা বেড়ে হয়েছে সাতটি।

কিন্তু কী এমন ম্যাজিক দেখিয়েছেন কেজরিওয়াল?

আনন্দবাজার বলছে, প্রথমবার ৪৫ দিনের মাথায় মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে আম আদমি পার্টির এই নেতা কার্যত বোকামিই করেছিলেন বলে অনেকেই কটাক্ষ করতেন। কিন্তু সেটা যে লম্বা দৌড়ের প্রস্তুতি ছিল, তা বোঝা গিয়েছে গত পাঁচ বছরে কেজরিওয়ালের উন্নয়নের রাজনীতিতে। গত পাঁচ বছরে সাধারণ মানুষের জন্য অনেক উন্নয়নমুখী প্রকল্প তৈরি এবং তার বাস্তব রূপায়ণের ওপর আস্থা রেখেছেন দিল্লিবাসী।

উন্নয়ন প্রকল্পগুলি কেমন?

২০১৫ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে যে সব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কেজরিওয়াল, সেগুলোর প্রায় সবগুলো ধরে ধরে বাস্তবায়ন করে দেখানোর রাজনীতিতে আপের এই নেতার বিশ্বাসযোগ্যতা বেড়েছে। দিল্লিবাসীর জন্য ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুতের বিল মওকুফ করেছে আপ সরকার। নারীদের জন্য সরকারি বাসে বিনামূল্যে ভ্রমণ এবং তাদের নিরাপত্তায় বাসে মার্শাল নিয়োগ, বিনা পয়সায় প্রতিদিন ৭০০ লিটার পর্যন্ত বিশুদ্ধ পানি দেয়ার মতো প্রকল্প বাস্তবে করে দেখিয়েছে দিল্লির সরকার। নতুন অনেক স্কুল তৈরি হয়েছে, পুরনো স্কুলগুলোর খোলনলচে বদলে আধুনিক রূপ দেয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে যুগান্তকারী বিপ্লব এনেছে কেজরিওয়ালের মহল্লা ক্লিনিক মডেল। এই ক্লিনিকগুলোতে বিনামূল্যে চিকিৎসার পাশাপাশি ওষুধও দেয় সরকার। এসব মহল্লা ক্লিনিক পরিদর্শন করেছে ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা। এসব সংস্থাও এই ক্লিনিকগুলোকে সার্টিফিকেট দিয়েছে।

ধারণ মানুষের জন্য এমন জনমুখী প্রকল্প হলেও এটাই ছিল কেজরিওয়ালের সুকৌশলী রাজনৈতিক ম্যান্ডেট। ভোটের প্রচারেও এই উন্নয়ন মডেলকেই হাতিয়ার করেছিলেন তিনি। বিজেপির ধর্মীয় মেরুকরণের উসকানিতে পা না দিয়ে প্রচার করেছেন শুধু নিজের সরকারের এসব জনমুখী প্রকল্পের সাফল্য। দিল্লির শাহিনবাগে এক মাসের বেশি সময় ধরে টানা বিক্ষোভ গায়ে মাখেননি কেজরিওয়াল। জেএনইউ বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার ঘটনায় মুখ খোলেননি তিনি। দিল্লিবাসীকে বোঝাতে পেরেছেন, জাত-পাত, ধর্মীয় বিভেদ নয়, উন্নয়নই তার পাখির চোখ।

অথচ কয়েক মাস আগের লোকসভা ভোটেও ভরাডুবি হয়েছিল আপের। সাতটি আসনের একটিতেও জিততে পারেনি আপ। সব ক’টি আসন ঝুলিতে পুরেছিল বিজেপি। তার ওপর নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহের মতো ধুরন্ধর রাজনৈতিক জুটির বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছে কেজরিওয়ালকে। এ দু’জন ছাড়াও দলের সব সাংসদ, একাধিক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এনে নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছে বিজেপি। ধর্মীয় মেরুকরণের তিরে বিঁধলেও তার বিরুদ্ধে কেজরীবাল সে সব গায়ে মাখেননি। সিএএ-এনআরসি নিয়ে কোনও জনসভায় একটি কথাও শোনা যায়নি তাঁর মুখে।

তার সঙ্গে বিরোধী ভোটকে একমুখী করার কৃতিত্বও কেজরীবালের প্রাপ্য। ভোটের ফলের দিকে নজর রাখলেই দেখা যাবে ভোট হয়েছে কার্যত দ্বিমুখী। একদিকে বিজেপি অন্যদিকে আপ এবং অন্যান্য। কংগ্রেসের নেতা কর্মীদের প্রতিও আহ্বান জানিয়ে কেজরিওয়াল বলেছিলেন, নিজের দল ছাড়তে হবে না, শুধু এবারের জন্য আপকে ভোট দিন। সেই আহ্বানে সাড়াও মিলেছে। বিজেপিবিরোধী ভোটের প্রায় পুরোটাই পকেটে পুরতে পেরেছেন কেজরিওয়াল।

দিল্লিতে পর পর দু’বার ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে ক্ষমতায় আসার নজিরও খুব কম দলেরই রয়েছে। ২০১৫ সালে আপ পেয়েছিল ৫৪.৩ শতাংশ ভোট। বিজেপির প্রাপ্ত ভোট ছিল ৩২.২ শতাংশ ভোট। এবার আপের আসন কিছু কমলেও ভোটপ্রাপ্তির নিরীখে খুব বেশি হেরফের হয়নি।

কিন্তু কেজরিওয়ালের যাত্রা এতটা কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। এমনকী ঘনিষ্ঠ মহলে কেজরিওয়াল স্বীকার করেছেন, সরাসরি রাজনীতিতে আসার কথা ক্যারিয়ারের শুরুতে কখনও ভাবেননি। কিন্তু ইন্ডিয়ান রেভিনিউ সার্ভিসের নিশ্চিন্ত সরকারি চাকরি ছাড়ার পর থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যেভাবে ঘটনা প্রবাহ এগিয়েছে, তাতে ধীরে ধীরে রাজনীতির গণ্ডিতে কার্যত নিজের অজান্তেই পা দিয়ে ফেলেছিলেন খড়গপুর আইআইটির সাবেক এই শিক্ষার্থী।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, কেজরিওয়ালের অজান্তেই সেই পথের সূচনা হয়েছিল সমাজকর্মী অন্না হাজারের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে দুর্নীতির বিরুদ্ধে টানা অনশন-ধর্না আন্দোলন। লোকপাল বিলের দাবিতে যেভাবে দিনের পর দিন অনশন ও শান্তিপূর্ণ অবস্থান আন্দোলন করেছিলেন কেজরিওয়াল, তাতে তার মধ্যে এক নতুন নেতার স্ফুলিঙ্গ দেখেছিলেন ভারতীয়রা। 

Leave a Comment.