প্রথম পাতা ভোট বাংলা আজকের রাশিফল সকালের বাংলা কর্ম সন্ধান পশ্চিম বাংলা বাংলার জেলা ভারতবর্ষ বিশ্ব বাংলা খেল বাংলা প্রযুক্তি বাংলা বিনোদন বাংলা        লাইফস্টাইল বাংলা EXCLUSIVE বাংলা GNE TV
ভোটযুদ্ধবিশেষ সংখ্যা

বাম প্রার্থী মীনাক্ষি মুখোপাধ্যায়, নন্দীগ্রামের কুরুক্ষেত্রে কোন এক পরীক্ষিতের যাত্রা শুরু

✍️ শুভব্রত রানা: কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ সমাপনের পূর্বে, নিজের পার্থিব জীবন শুরু হওয়ার প্রাক্কালে মাতৃ জঠরে পরীক্ষিত হয়েছিলেন পরীক্ষিৎ। সামনেই রাজ্যের নির্বাচনী যুদ্ধ। সেই রাজনৈতিক সমরে অভিষেক ঘটিয়ে পরীক্ষিত হতে চলেছেন এক নব্য সেনানী। নন্দীগ্রামের সিপিআইএম প্রার্থী মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়।

২০২১ এ ৮ দফায় ভোট গ্রহণ রাজ্যের নির্বাচনী ইতিহাসে দীর্ঘতম বিধানসভা নির্বাচন। ২৯৪ টি বিধানসভা আসন, ১২৫ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী, ১,০১,৯১৬ টি বুথ আক্ষরিক অর্থে ভোট যুদ্ধই বটে। আর সেই যুদ্ধ আবর্তিত হতে চলেছে ‘কুরুক্ষেত্র’ নন্দীগ্রাম আসনকে কেন্দ্র করে। রাজ্যের সবচেয়ে আলোচিত দুই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী, তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং প্রাক্তন তৃণমূল নেতা বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী।

একজন নিজের পুরাতন নির্বাচনী কেন্দ্র ভবানীপুর ছেড়ে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করতে এসেছেন, অন্য জন নিজের প্রাক্তন নির্বাচনী ক্ষেত্রে প্রাক্তন দলনেত্রীকে হাফ লাখ ভোটে পরাজিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সেই পরস্পর যুযুধান রাজনৈতিক হেভিওয়েটের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বীতায় অবতীর্ণ রাজনীতিতে আপাত নবীন মীনাক্ষী। এই রাজনৈতিক নির্বাচন তাঁর জন্য পরীক্ষাই বটে। তবে শুধু মাত্র জেতার জন্য নয়, পরবর্তী রাজনৈতিক ভবিষ্যতের পরীক্ষা। অবশ্য নির্বাচনী ক্ষেত্রে তিনি ‘নবীন’ হলেও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে রাজ্য রাজনীতিতে মীনাক্ষী যথেষ্ট পরিচিত। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর মীনাক্ষীর রাজনৈতিক হাতেখড়ি ছাত্র রাজনীতি থেকে এসএফআই এর সঙ্গে। যদিও তাঁর রাজনৈতিক দীক্ষা তাঁর বাবা তথা কৃষক আন্দোলনের নেতা সাগর মুখোপাধ্যায় এবং মা তথা সিপিএমের মহিলা সংগঠনের নেত্রী পারুল মুখোপাধ্যায়ের কাছে। ২০১২ সালে মীনাক্ষী সিপিএমের যুব সংগঠন ডিওয়াইএফআই এর কুলটি জোনাল কমিটির সম্পাদক হন। বর্তমানে তিনি ডিওয়াইএফআই এর রাজ্য সভানেত্রী।

বাম দলগুলির অন্দরে শুদ্ধিকরন ও তরুণ নেতা কর্মীদের সামনের সারিতে নিয়ে আসার দাবি বহু দিনের। রাজ্যের বিগত নির্বাচন গুলিতে একের পর এক বিপর্যয়ের পর আসন্ন ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে একাধিক তরুণ মুখকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে প্রার্থী করেছে সিপিআইএম। তারই অন্যতম সংযোজন রাজ্যের সবচেয়ে উত্তপ্ত আসন নন্দীগ্রামে নবীন মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়কে প্রার্থী করা। সেই নন্দীগ্রাম যেখান থেকে শুরু হয়েছিল রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলের ইতিবৃত্ত। এই নন্দীগ্রামে সংগঠিন আন্দোলন থেকেই রাজনৈতিক উত্থান নন্দীগ্রামের অন্য দুই প্রধান প্রার্থী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারীর।

নন্দীগ্রামে বিধানসভা আসনে বরাবর প্রার্থী দেয় অন্যতম বাম শরিকদল সিপিআই। ১৯৫২ সাল থেকে এই আসনে সিপিআই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এসেছে। ১৯৭৭ এবং ১৯৯৬ সাল ছাড়া ১৯৬৭ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত টানা এই আসনে জিতে এসেছে বামেরা। ছন্দ পতন ঘটে ২০০৬ সালে। ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠায় বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দেন ইলিয়াস মহম্মদ শেখ। ২০০৯-এর উপ নির্বাচনে জয়লাভ করেন তৃণমূলের প্রার্থী ফিরোজা বিবি। ২০১১ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের বছরে তৃণমূলের ফিরোজ বিবি সেই জয় অক্ষুন্ন রাখেন। ২০১৬ সালে নন্দীগ্রাম আন্দোলনের অন্যতম নেতা শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূলের প্রার্থী হিসেবে এই আসনে জয় লাভ করেন।

ফলে রাজনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই আসনে সাহসী পদক্ষেপ হিসাবে এক সাহসী যুব নেত্রীকে প্রার্থী করেছে সিপিএম। বামেদের সাম্প্রতিক বিভিন্ন আন্দোলনের প্রতিবাদী ও সাহসী মুখ মীনাক্ষি মুখোপাধ্যায়।

সাম্প্রতিক অতীতে ডিওয়াইএফআই এর নেতৃত্বে বাম ছাত্র যুব সংগঠনগুলির নবান্ন অভিযানের অন্যতম নেত্রী ছিলেন তিনিই। সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বিক্ষুব্ধ মিছিলকে। পুলিশি ব্যারিকেড, লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, জল কামানের সামনেও ছিলেন অকুতোভয়। পুলিশের মারে লুটিয়ে পড়া ডিওয়াইএফআই কর্মী মইদুল ইসলাম মিদ‍্যার প্রাথমিক শুশ্রূষাতেও এগিয়ে আসতে দেখা গিয়েছিল এই ডাকাবুকো নেত্রীকে। সুতরাং বলা যায়, একদা বাম গড় নন্দীগ্রামের নির্বাচনী পরম্পরা সঠিক উত্তরাধিকারের দায়িত্বেই দিয়েছে বাম নেতৃত্ব।

বামেদের আসন্ন ভোটে একাধিক তরুণ মুখের আগমনে এবং অন্যান্য পদক্ষেপে পরিষ্কার প্রার্থী তালিকা নির্বাচন ও সাংগঠনিক পদক্ষেপ শুধুমাত্র আসন্ন ভোটে জয়ের জন্য হচ্ছে না।

পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে ভবিষ্যত রাজনৈতিক রূপরেখা বিশ্লেষণ করেই। সিপিএমের রাজ্য কমিটি থেকে শুরু করে রাজ্য নেতৃত্ব মন্ডলীতে বেশির ভাগ বয়স্ক নেতা। অনেকেই শারীরিক ভাবে অসুস্থ অথবা রাজনৈতিক অবসরের সন্নিকটে।

সেই পরিস্থিতিতে আসন্ন ভোটের প্রার্থী নির্বাচন শুধু ভোটের চিন্তা থেকে নয়, সিপিআইএমের আগামী নেতৃত্বদের রাজনৈতিক ভাবে সামনে আনা ও রাজনৈতিক ভাবে দূরদর্শী করে তোলার সোপান হিসাবে নেওয়া হচ্ছে। সেই কারণেই নন্দীগ্রামের মতো আসনেও অভিজ্ঞতার পরিবর্তে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তারুণ্যকে। নির্বাচনী রাজনীতির পরবর্তী বাম উত্তরসূরি তৈরি করার জন্য।

তাই নন্দীগ্রামে আসন্ন নির্বাচন তৃণমূল ও বিজেপির কাছে ভোট, জয়, অহং এর লড়াই হলেও সিপিআইএম প্রার্থী মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ন। জয় পরাজয়ের ঊর্ধ্বে এটি আসলে ভবিষ্যতের এক রাজনৈতিক সেনানীর রাজনৈতিক পরীক্ষা।

একই রকমের খবর