আন্তর্জাতিক

একুশ আমার অধিকার-শামসুল আলম জুয়েল

✒️শামসুল আলম জুয়েল:ফুটন্ত গোলাপের মধ্য থেকে যেমন বের হয় ঘ্রাণ; প্রতিটা মায়ের আচরণের মধ্যে থেকে তদ্রূপ বের হয় একজন শিশুর কথা কাকলির মান। শিশুটি মায়ের মধ্যমণি হয়; মায়ের অকৃত্রিম স্নেহ পেয়ে ধন্য মনে বেড়ে ওঠে জগৎ সংসারে। মায়ের আচরণই শিশুর আচরণ গুণে তা বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। তাই মায়ের ভাষাটিই একমাত্র শিশুর ভাষা বলে প্রাধান্য পায়। এটিই হলো মাতৃ ভাষা। আমরি আমাদের বাংলা ভাষা। আহা—কি মিষ্টতা!

এই ভাষাতেই আমরা কথা বলি, এই ভাষাতেই আমাদের মনের ভাব প্রকাশ করি, এই ভাষাতেই আমরা ছন্দ গড়ি, ভাষার শুদ্ধ ব্যবহারে আমরা সুঠম হই। আমরা আজ আমাদের এই ভাষার ব্যবহারে নিজেদের বিশ্বের কাছে মেলে ধরতে পারছি। অথচ এই ভাষা নিয়ে চক্রান্ত হযেছে যুগে যুগে। একে বারবার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হযেছে। কিন্তু মায়ের ভাষা, প্রাণের ভাষাকে কি সহজে কেড়ে নেওয়া যায়?
১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে প্রথম মত পোষণ করেন একজন বৃটিশ লেখক ন্যাথিনিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেড। এরপর বহুদিন গড়িয়ে যায়। প্রায় তিন যুগ পরে এসে ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে ভারতের শান্তি নিকেতনে কবি রবীন্দ্রনাথ সভাপতিত্বে ভারতের সাধারণ ভাষা কি হওয়া উচিত তা নিয়ে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাঙালি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উক্ত সভায় হিন্দির প্রতি মত পোষণ করলে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী ড.মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ স্পষ্টত বিরোধীতা করে বাংলাকে ভারতের সাধারণ ভাষা করার প্রস্তাব পেশ করেন।

ওই সময়ে হিন্দি- প্রেমিকরা হিন্দিভাষাকে সমর্থন করে গান্ধীজীর বরাবরে একটি পত্র লেখেন তা হলো-‘the only possible national language for intercourse is Hindi in India.’

নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী লিখিতভাবে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দেন ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে বৃটিশ সরকারের কাছে। ১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সম্পাদক আবুল হাশিম প্রাদেশিক কাউন্সিলের কাছে পেশকৃত খসড়া ম্যানিফেস্টোতে বাংলাকে পূর্ব বাংলার রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করেন। ১৯৪৭ সালের ৩০ জুন দৈনিক আজাদ পত্রিকায় পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা প্রবন্ধে আব্দুল হক বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অভিমত প্রকাশ করেন।

১৯৪৮ সাল নবগঠিত পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম বৈঠক বসে করাচিতে। বৈঠকের শুরুতেই উর্দু ও ইংরেজিকে গণপরিষদের সরকারি ভাষা বলে ঘোষণা করা হয়।
শুরু হয় পূর্ব বাংলার বিরূপ প্রতিক্রিয়া। গণপরিষদ সদস্য বাবু ধীরেন্দ্রনাথ এক সভায় একটি মূলতবি প্রস্তাব গঠন করেন এবং উর্দু-ইংরেজির সাথে বাংলাকেও গণপরিষদের সরকারি ভাষা ঘোষণার দাবি জানান।
পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার সব মুসলিম সদস্যরা এক জোটে এই প্রস্তাবকে না করেন। শুরু হয় পূর্ব বাংলার মানুষের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। পূর্ব বাংলার সমস্ত বাঙালি ফুসে ওঠেন। তারা ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। সারা বাংলা উত্তাল হয়। এই সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন বাংলার কয়জন দামাল ছেলে। ছাত্র সমাজের বলিষ্ঠ পদক্ষেপে ঢাকার রাজপথ সরগরম ও উত্তাল হয়।
১৯৪৭ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে ভাষা-বিক্ষোভ শুরু হয়। ১৯৪৮ সালের মার্চে এ নিয়ে সীমিত পর্যায়ে আন্দোলন হয় এবং ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি যার চরম প্রকাশ ঘটে। এইদিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা অমান্য করে রাজপথে বেরিয়ে এলে পুলিশ তাদের উপর গুলি চালায়। এতে বরকত, জব্বার, আবদুস সালাম, রফিক সহ ছয়জন ছাত্র-যুবক হতাহত হন।

রাজপথে প্রতিবাদী মিছিল:

এ ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ ঢাকাবাসী ঢাকা মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে সমবেত হন। নানা-নির্যাতন সত্ত্বেও ছাত্রদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ জমাতে পরের দিন ২২ ফেব্রুয়ারি পুনরায় রাজপথে নেমে আসে। এদিন নবাবপুর, রণখোলা ও ভিক্টোরিয়া পার্ক এলাকায় পুলিশ মিছিলে গুলিবর্ষণ করে। এ দিনে শহীদ হন শফিউর রহমান, আব্দুল আউয়াল ও অহিদুল্লাহ সহ একাধিক ব্যক্তি।

শহীদ মিনার স্থাপন ও ভাঙ্গন:
১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তারিখের রাতে ছাত্র-জনতার এক বৈঠকে নেতৃবৃন্দ শহীদদের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য একটি শহীদ মিনার স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন এবং সেই রাতের অন্ধকারেই গুলিবর্ষণের স্থানে নিজেদের নকশা অনুযায়ী ইট দিয়ে নির্মিত হয় শহীদ মিনার। কিন্তু ২৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ তারিখে পুলিশ এ শহীদ মিনার ভেঙে দেয়। সে জন্য ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৩ তারিখে প্রথম শহীদ দিবস পালনের জন্যে কাগজ দিয়ে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়। পরের দুই বছরও ঐ স্থানে কালো কাপড় দিয়ে ঘিরে শহীদ মিনারের অভাব পূরণ করা হয়।
রফিক, সালাম, বরকতসহ অসংখ্য নাম-না-জানা শহীদের রক্তবীজ থেকে জন্ম নিল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের ভিত্তি। মাতৃভাষার জন্য তাদের আত্মত্যাগের ভাস্বর এই দিনটি ১৯৯৯ সালে পেলো বিশ্ব স্বীকৃতি।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি :

গত শতাব্দীতে বাঙালি জাতির জন্যে সবচেয়ে বড় অর্জন ছিলো ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভ। এটা ছিলো মূলত অনেক বড় প্রাপ্তি।
১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে ইউনেস্কোর ৩০তম সাধারণ সম্মেলনে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন। একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে’ পরিণত করার ভাবনা প্রথম চিন্তা করেন কানাডার ‘ভাংকুভারে’ প্রবাসী বাঙালি জনাব রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম। বাংলা ভাষার জন্যে লক্ষ লক্ষ বাঙালি প্রাণ দিয়ে হয়ে আছেন মহীয়ান, তাঁদের সম্মানার্থে কিছু একটা করার দরকার। সারা বিশ্বের মানুষের নিকট তাদের এই মহান অবদান তুলে ধরার জন্যে। এ বিষয়ে জাতিসংঘের তৎকালিন মহাসচিব কফি আনানের নিকট ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে একটি চিঠি লেখেন ও বহু ভাষাভাষী সংগঠন গড়ে তুলে পুণরায় কফি আনানের নিকট চিঠি পাঠানো হলে জাতিসংঘ থেকে দিকনির্দেশনায় বিষয়টি প্যারিসে ইউনেস্কোর সদর দফতরে প্রেরণ করেন। বিষয়টি ইন্টারেস্টিং তাই ইউনেস্কো এমন বিষয় আলোচনা করে এমন মনোভাবে তাদের নির্দেশনা ছিলো কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইউনেস্কে প্রস্তাব করলে চলবে না, প্রস্তাবনা হতে হবে কোন এক দে্শের পক্ষ থেকে।

রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম বিষয়টি সবিস্তারে ব্যাখ্যা দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠান। শিক্ষামন্ত্রী সচিব কাজী রকিব উদ্দিন তখন এটা তদানিন্তন শিক্ষামন্ত্রী জনাব এএসএইচকে সাদেককে অবহিত করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে ইউনেস্কো সদর দফতরে এ প্রস্তাব পাঠানোর শেষ তারিখ ছিল ১০ই সেপ্টেম্বর। শিক্ষামন্ত্রী বিষয়টি তাৎণিকভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টিতে আনেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে সময় নষ্ট না করে ত্বরিত সিদ্ধান্ত দেন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্যে। সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কতৃক ‘ভাষা ও সংস্কৃতির বিভিন্নতা সংগঠন’ সম্পর্কিত ইউনেস্কোর নীতিমালার আলোকে ইউনেস্কোর ৩০তম সাধারণ সম্মেলনে (২৬ অক্টোবর-১৭ নভেম্বর) একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করার জন্য প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে পেশ করা হয়।

সকল দিক থেকে নির্দেশনা পেয়ে তারা বিষয়টি প্যারিসে ইউনেস্কোর সদর দফতরে প্রেরণ করেন।
ইউনেস্কোর টেকনিক্যাল কমিটি কমিশন-২-এ বাংলাদেশের প্রস্তাবটি পূর্ব নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী উত্থাপিত হয় ১২ই নভেম্বর। সকাল ১০টায় যথারীতি কমিশন-২-এর কার্যক্রম আলোচ্যসূচি অনুযায়ী শুরু হয়।

কমিশনের সভাপতি ‘স্লোভাকিয়ার লুডোভিট মোলনা’র একের পর এক প্রস্তাব উত্থাপন করছেন বিতর্ক হচ্ছে, সংশোধনী আসছে, কোনোটা গৃহীত বা পরিত্যক্ত হচ্ছে। একের পরে এক ঝামেলা হচ্ছে আলোর মুখ দেখেও তা যেন তলিয়ে যাচ্ছে। এমন অবস্থায়, সভাপতি পর পর দু’বার জিজ্ঞাসা করলেন প্রস্তাবের ওপর কারো কোনো আপত্তি বা মন্তব্য আছে কি না। কারো কোনো আপত্তি না থাকায় সভাপতি তিনবার হাতুড়ি পিটিয়ে ‘প্রস্তাবটি গৃহীত হলো’ বলে ঘোষণা দিলেন। হাততালিতে মুখরিত হলো পুরো সম্মেলন কক্ষ।
৪ঠা জানুয়ারি ২০০০ ইংরেজি তারিখে ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ‘কাইচিরো মাটসুরা’ এক চিঠিতে ইউনেস্কোর সব সদস্য রাষ্ট্রের প্রতি তখন থেকে প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালনের আহ্বান জানান।

ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়ে শুধু মাতৃভাষার জন্য আমাদের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগকেই স্বীকৃতি দেয়নি, অমর একুশের শহীদদের আত্মদান থেকে উৎসারিত স্বাধীনতা আন্দোলন ও স্বাধীনতা অর্জনকেও মর্যাদা দিয়েছেন। জাতি হিসেবে আমাদের পৃথিবীর বুকে মহিমান্বিত করেছে। আজ বিশ্বের ১৯০টি দেশে এখন প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ উদযাপিত হচ্ছে। আজ বিশ্বের সকল দেশের মানুষ জানছেন এই দিনটিতে ঢাকার বুকে আসলে কী ঘটেছিলো? তারা জানতে পারছেন আমাদের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের নানাভুত কথামালা। এটা যে জাতি হিসেবে আমাদের জন্য কত বড় অর্জন তা ভাবা যায় না। সত্যিই আমরা গর্বিত বাঙালি।

আজ আমরা যা পেলাম তাকে কি কখনো ভুলা যায়? এক সাগর রক্তের বিনিময়ে গড়া এ সবুজের বাংলাভূমি। আমরা সকলে ভীষণ দাম দিয়ে চলি। আমরা আমাদের দেশকে ভালোবাসি, আমরা দেশের পণ্য ব্যবহার করি। দেশ আজ অনেক উন্নত। আমাদের আজ কোন কিছুরই অভাব নেই। তবুও কী যেন নেই, কী যেন নেই এমন জ্বরে ভুগছি। আমরা এমন নেই এর জ্বর থেকে বের হয়ে এসে বাংলার প্রতি ভালোবাসা অক্ষুণ্ন রাখতে চাই।

আসুন আমরা আমাদের বাংলাকে ভালোবাসি, আমরা আমাদের দেশকে ভালোবাসি, আমরা আমাদের ভাষাকে ভালোবেসে মেলে ধরি সারা বিশ্বের কাছে। ভালোবাসায় জগৎ গড়ি আর শুদ্ধ ভাষায় কথা বলে এই ভাষার ব্যাপ্তি বাড়ায়। মধুর ভাষায় যেমনটি কথা বলি তেমনটি আমরা সকলে লিখি আর সাহিত্য রচনা করি। মূলকথা এই ভাষা বেশি বেশি চর্চা করে রিসার্চের মাধ্যমে নিয়ে যায় বিশ্বের সেরা ভাষার কাতারে। আসুন আমরা সেই পথেই অগ্রসর হই।
আজ একুশে ফেব্রয়ারি—মহান ভাষা দিবস।


Tags
Advertisement with GNE Bangla

একই রকমের খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
Use GNE Bangla App Install Now
Subscribe YouTube Channel
Close