লেখনীবিশেষ সংখ্যা
Trending

মা দুগ্গা, পুজো ও পুজো সুন্দরীরা

অঞ্জলি নয় – কটাক্ষ ছলনে
ভ্রু ধনুতে বান
কে তুমি ললনে ?

✒️শুভব্রত রানা: “অশ্বিনের শারদ প্রভাতে” মা দুগ্গা পুজো নিতে আসেন বটে, তবে তাঁর ভাগের পুজো অন্যপাত্রীরা জবরদখল করে। আসলে পুজো আসছে ভাবটা সত্ত্বগুনীর দল আকাশ-বাতাস-মহালয়ায় বুঝলেও, আমাদের মতো কিছু বিশ্ববাচাল পথ ঘাট মল শোরুমের ‘শ্রী’ময় বলা ভালো ‘নারী’ময় হয়ে ওঠা দেখে বুঝে ফেলে। ফুচকার ঠেলাগুলোর সামনে সমানুপাতিক ভীড় বাড়ে আর আমরাও জিভে টক ও চোখে মিষ্টতার অনুভবে ফুচকার গুনতি ভুল শুরু করি। আর ফুচকাওয়ালা নাকি শাড়ির দোকানের ছেলেটি কে বেশি সৌভাগ্যবান তা নিয়ে অমীমাংসিত তর্ক শুরু হয়।

বরাবর কিন্তু ব্যাপারটা এই রকম ছিলনা। একটা সময় ছিল আমরাও আকাশ বাতাস বেশি দেখতাম। তারপর ঐ ‘কৈশোর ঝঞ্জা তুলিল’ এবং ‘টেস্টোস্টেরন গ্রহণ লাগাইল’। ব্যস! আমরাও মদন শরে আহত হয়ে ব্যাধকেই ‘দেবী’ মানলাম। মা দুগ্গা ‘রোষকসায়িত লোচন’ দেখালেন বটে, তবে ঠোঁটের কোণে বোধহয় মুচকি হাসলেনও। তখন সদ্য কৈশোর। আমাদের গ্রাম্য অভিধানে পুজোসুন্দরী, আনন্দসুন্দরী, সানন্দাসুন্দরীদের তুমুল শোরগোলে ‘বিজ্ঞাপিত’ আবির্ভাব ঘটেনি। পুজোর মাসদুয়েক আগে থেকেই মা-জেঠিমাদের বগলদাবা হয়ে বিনা বেতনের কুলিগিরির চাকরি নিয়ে দোকান ঠ্যাঙাতে বেরিয়ে পড়তে হতো। কোনটা ঢাকাই, কোনটা সিল্ক, কোনটা বিষ্ণুপুরী তা বোঝার ক্ষমতা মা দুগ্গা কোনো দিনই দেননি ফলে সেই দু-তিন ঘন্টা ব্যাপী পছন্দ যুদ্ধের সময়ে ‘স্তূপীকৃত শাড়ির’ আড়ে আমারই বয়সী সদ্য কিশোরীর আধো তাকানোই তখন(এখনও) প্রধান প্রেরণা। মেয়েটির মা একটা শাড়ি মেয়েটির গায়ে ফেলে তাকে শুধলেন,

-কেমন ?

মুখচেনা পাশের গ্রামের মেয়েটি মায়ের চোখ বাঁচিয়ে আমার দিকেই তাকালো! যেন উত্তরটা এইদিক থেকেই যাবে। আর এইদিকে তখন মুখ চোখ দুই গোল। আসলে প্রকৃতি বেশ কড়া নারীবাদী। আমাদের অর্থাৎ পুরুষদের নিঃস্ব করে নারীকে গড়েছে সমস্ত ঐশ্বর্য ঢেলে পরম মমতায়। তাই আমরা ভিখিরীর দল শুধু তাকিয়েই থাকি। হঠাৎ মায়ের ডাক পড়ল। মায়েদের কাছে ডাক এবং ডাকনাম ডাকাডাকির সমার্থক। সেই ডাকনামের অযাচিত বদনামে অন্যদিকে মুচকি হাসি জাগলো। আর আমি বেমাক্কা ‘বদ’নামে রাগে আগুন তেলে বেগুন।
মা বলল, পাঞ্জাবিটা দ্যাখ হবে নাকি?
আমি চোখ কান বুজে বললাম – হবে।
দোকানদার পাকামি দেখিয়ে বলে, গলিয়ে দ্যাখো। ছোটোও হতে পারে।

আমি পড়ে থাকা জামার ওপর দিয়েই গলাতে যাচ্ছি জেঠিমা বলে উঠল,
-আরে! জামাটা খুলে পড়, নাহলে বোঝা যাবে না।

শালা বলে কি…?
জনসমক্ষে বস্ত্রহরণ!! আমার ব্যোমকে যাওয়া মুখ দেখে জেঠিমা বলে, এখানে কে দেখছে তোকে? খুলে পড়।

লে_ সুন্দর সুতো ছাড়ছিলাম, পুরো ভোকাট্টা।
ঐদিকে তখন হাসির লহরী উঠেছে। হয়ে গেল।
-যাহোক নাও।
বলে পত্রপাঠ সেখান থেকে কেটে পড়লাম এবং সোজা বাড়ি। আর থাকা যায়? কানের পশ্চাদপটে তখনও লহরী বাজছে।

“এলাচের গন্ধ মাখা হাসিতে বাতাসের মধ্যে উপহাস।“

সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে মহালয়া শোনার বয়স ও ইচ্ছে দু’টোই তখন পেরিয়ে এসেছি, তাও আধো ঘুমে মহালয়ার সুরে মনে হতো পুজো এসে গেল। ঐদিন বাতাসের গন্ধটা যেন অন্যরকম লাগত। বাড়িতে একটা খুশি খুশি ভাব শুরু হয়ে যেত, পরিকল্পনা ও নির্দেশ আসত পুজোর কোনদিন কোন জামাটা পড়ব। জেঠিমা নতুন কেনা পাঞ্জাবিটা হাতে দিয়ে বলত,
-এটা অষ্টমীতে পড়িস।

আমাদের মাথায় তখন অন্য চিন্তা , সাইকেলে কোন কোন গ্রাম পরিক্রমা হবে। অবশ্য সূচিপত্রে সেগুলোই প্রাধান্য পেত যেখানে গেলে ভর দুপুরেও সুন্দরীদের দেখা মিলবে। কারণ সকাল সন্ধ্যে মাঠের মন্ডপে বসতেই হবে। কয়েকজন বন্ধু তখন সদ্য প্রেম শুরু করেছে। তাই তাদের বিশেষ অনুরোধে সূচিপত্রে বিশেষ বিশেষ মন্ডপও ঠাঁই পেত।

আমাদের কাছে ষষ্ঠী আর সুন্দরীদের দর্শন শুরু তখন সমার্থক। কারন আর কিছুই না , উপলক্ষ কলাবউ চান ও ফলাফল বৌদি দর্শন। ঐদিন পাড়ার অসূর্যম্পশ্যার দলের আঁচল তখন ঘোমটা নয় গাছ-কোমর। ভেজা শাড়ীর লীলায়িত ভঙ্গি যে কতটা মোহময় সেটা সেই প্রথম উপলব্ধি। চোখের সামনে এক মুগ্ধ বিস্ময়।
“বুক ভরা মধু , বঙ্গের বধূ” (দাদা এটা রবীন্দ্রনাথ। উল্টোপাল্টা ভাববেননা যেন!!)

সপ্তমীতে আসল শুরু। ছেলেপুলের দল বাড়ি ভুলল আর মন্ডপেই খুঁটি গাড়ল। মেয়েরাও যেন এইসময় বুঝতে পারে সামনের দিন গুলো তাদের। তাই তাদের তাকানো, চলন-বলন সব বেবাক বদলে যায়। আর পুজোয় মুগ্ধবোধের অভাবে বোধহীন অভাগার দল মাকড়সার নেত্য শুরু করে দেয়। সরু চাউনি, হালকা মৃদু হাসি, গোপন কটাক্ষের প্রভাবে তারা সব প্রবল উৎসাহে নাচতে নাচতে খাঁচার দিকে এগিয়ে চলে। আর খাঁচা হাতে রাজেন্দ্রানীর দল সামনে সামনে এগিয়ে যায়।

দর্পিতা কামিনীর বিস্তার করা মোহ, এর থেকে রক্ষা পায়নি শুম্ভ নিশুম্ভ মায় মহিষাসুর। সকলেই আবিষ্ট হয়েছে মোহিনী কটাক্ষে আর আত্মসমর্পণ করেছে অসহায়ের মতো।

ত্রিলোক জয়ী শুম্ভ-নিশুম্ভ প্রবল পরাক্রম ও যুদ্ধনিপুনতায় স্বর্গে নিজেদের অধিকার কায়েম করেছে, হয়ে উঠেছে অজেয়। দেবলোক পরাজিত, অপমানিত, ত্রস্ত। আবির্ভূতা হলেন দেবী কৌশিকী, কামিনী রূপে। মায়ার বিস্তারে চণ্ড-মুণ্ডের মাধ্যমে অভিভূত করলেন শুম্ভ-নিশুম্ভকে, দিলেন যুদ্ধের মাধ্যমে তাঁকে জয় করার প্রস্তাব। সেই চিরপুরাতন পুনরাবৃত্তি যা চলে এসেছে আদিম গুহামানবের কাল থেকে। সমস্ত পরাক্রম জলাঞ্জলি দিয়ে কেবল পেশি শক্তির দ্বারা নারীকে জয়ের বাসনা, যা বারবার ধ্বংস করেছে পরাক্রমী পুরুষকে। সেই একই বাসনা শুম্ভ-নিশুম্ভর মধ্যে জাগাল দম্ভ, ঔদ্ধত্য, অহংকার। স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি ছলনায় বিনষ্ট হয়ে তাদের পাশবিক প্রবৃত্তি মাথাচাড়া দিল। যুদ্ধে দেবী একে একে প্রকাশ করলেন চন্ডিকা, কালি, ব্রহ্মানী, বৈষ্ণবী, মাহেশ্বরী, বারাহী, নারসিংহী প্রভৃতি রূপ। রক্তবীজ সেনা , চণ্ড-মুণ্ড সহ শুম্ভ-নিশুম্ভ পরাজিত ও নিহত হল।

প্রায় একই প্রকার ভুলের ভুক্তভোগী মহিষাসুর। তার সুরের অভাব তার সত্ত্বগুণকে চাপা দিয়ে প্রকাশ করল রজঃ-তমোর আধিক্য। নারীকে শুধু কামিনী রূপে কল্পনা করে সে হল পুরুষের অবধ্য। সেই কামিনী রূপ তার শৌর্যকে বশীভূত করল। কামিনীস্বরূপের মায়ায় সে ভুলল নারীর শক্তিস্বরূপ। মায়ার ছলনায় সত্ত্বগুন নিশ্চিহ্ন করে সে শুধু তমোতে আচ্ছন্ন হল। ঠিক যেমন, দিকভ্রান্ত হয়ে পুরুষেরা নারীর কামিনী মূর্তিটাই একান্ত সত্য বলে বিচার করে। ফলাফল “শক্তিস্বরূপিনীর” মায়ার ভুলে সত্ত্বের বিস্মরণ ও আসুরিক-পাশবিক-তামসিক সকাম কর্ম এবং আসক্তির প্রভাবে সমূলে বিনষ্ট। সেই একই তামসিক প্রভাব মহিষাসুরের বিনাশ করল। দেবী তাকে তিনবার বধ করলেন উগ্রচণ্ডা ও দুর্গা রূপে।
তেমনই করে পরাজিত হয় পুরুষজাতও। মায়ার প্রবঞ্চনায় পরাভূত হয় তার শক্তির দম্ভ, বিদ্যার তেজ, বুদ্ধির অহংকার। আড়ালে অট্টহাসি হাসে মায়াবিনী।

পুজো মানে পিতৃপক্ষের অবসান। মা দুগ্গা পুরো সনাতনী কেতায় বুকে পা তুলে ত্রিশূল বাগিয়ে পিতৃপক্ষের পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটান। কিন্তু আমাদের বঙ্গদেশে পিতৃঅসুর আগে থেকেই অক্কাপ্রাপ্ত। নিজের ত্রিশূলে নারীর হাতে আগেই তার বধ হয়ে আছে। আর খাতায় কলমে মাতৃপক্ষ এলে দ্বিগুণ মাতৃপক্ষ শুরু হয় আর কি। পুরো অঙ্কের নিয়ম , কোন গোঁজামিল নেই। লাভের মধ্যে ইত্যবসরে ‘বাহনরাও’ কারনে অকারনে ঘ্যাঁক করে তেড়ে আসে। এই ‘ডাবল’ এর সময়ে সাধারণরাও যে অসাধারণ হয়ে উঠবে এতে আর আশ্চর্য কি। শাড়ি সাপটে, কুঁচি আটকে জ্যান্ত দূর্গারা সব সরস্বতী, লক্ষ্মী সমভিব্যাহারে টুপ করে ধরাধামে অবতীর্ণা হন এবং যত্রতত্র সর্বত্র দেখা দিতে শুরু করেন। এইসময়ে ‘গুটিপোকা যত প্রজাপতি হয়ে যায়’। চেনা মেয়েরা সব অচেনা লাগতে থাকে।
পুজোর সাথে ছেলেদের অনেক কিছু প্রথম লুকিয়ে থাকে। যেমন ফ্রক পড়া খেঁদি-পেঁচিরা পুজোতেই প্রথম ছেলেদের কাছে নারী হয়ে ধরা দেয়। তেমনই পুজোতেই ছেলেদের প্রথম লুকিয়ে সিগারেট প্রথম কারন বারি আর অনেক সময় প্রথম চুমুও। পুজোতেই অনেক নিষিদ্ধ ‘না’ এর বেড়া টপকে ‘হ্যাঁ’য়ের শিহরণ। সারা বছর টিউশনির যে সুন্দরীর পিছনে ঘুরে ঘুরে, দিস্তা দিস্তা চিঠি লিখেও শুধু না আর না; পুজোতেই হঠাৎ করে কেন যেন সেই ‘না’টাই সলজ্জ ‘হ্যাঁ’ হয়ে যায়।
পুজোর মন্ডপে সকাল থেকে আড্ডার সাথে অনুপান চেনা মেয়েদের অচেনা আবির্ভাব। শুরু হয়ে যায় কালনেমির লঙ্কাভাগ।
“লাল শাড়িটা আমার।“ “নীলের দিকে তাকাস না, বৌদি হয় তোর।“
-ঐ মেয়েটা কে রে?!
বন্ধুর ডাকে তাকাই। মেয়েটার সাথে চোখাচোখি হয়। আমায় ডাকছে। কে রে ভাই! ভালো করে দেখে চিনতে পারি। ও বাবা !! এ যে আমাদের পাড়ার টুনি(ভালো নাম জানা নেই। ডাকনাম টুনটুনি)!! পাশের বন্ধুটি উৎসাহ দেয়,
-যা ভাই। কথা বলে আমার জন্য সেট করে দে। যা খেতে চাইবি খাওয়াবো।

অগত্যা, এগিয়ে যাই….

  • কি রে। শাড়ী পড়ে নারী। তোর ফ্রক কোথায় গেল?
  • ধুত বাপ্পাদা! তুইও না! পুজোতে কেউ ফ্রক পড়ে?
  • তা ভালো। শাড়িটা কার ঝাপলি, কাকিমার? দেখিস পায়ে জড়িয়ে ধপাস হোসনা যেন।
  • মোটেও পড়ব না। তোর মতো ক্যাবলা নাকি? আর কারো ঝাপিনি, আমার। জেঠু দিয়েছে। ভালো না রঙটা ?
  • খুব ভালো। ঐ দেখ। তোর খেপুদাদা দেখে কেমন ভ্যাবলা হয়ে গেছে।
  • তোর বন্ধুগুলো পুরো ফালতু। কেমন হাঁ করে তাকিয়ে..!
  • তাকাবে না? ভাবছে চোখে পিঁচুটি, নাকে সিকনি কটকটিটা অ্যাত্তো সুন্দরী কি করে হল। হাঃ হাঃ হাঃ!!

নিজের কৌতুকে নিজেই অট্টহাস্য করি। কিন্তু ঐ দিকে কঠিন চাউনি। যেন ভস্ম করে দেবে! এবার আমি ভেবলে যাই।

  • ইয়ে! তোর খেপুদা কথা বলবে বলছে। বলবি?
  • না। আর কি আমার আমার বলছিস!? খেপুদা তোর বন্ধু। যার সাথে কথা বলার ইচ্ছে সেই বুঝছে না। শুধু অন্যের কাছে গছাচ্ছে! কারোর সাথে কথা বলবনা আমি।
    বলেই টুনি বোঁ করে ঘুরে এগিয়ে গেল। আবার ফিরে এসে সেই রাগরাগ মুখে বলল,
    -আজ রাতে আমাদের বাড়িতে খাবি। আমি বড়মাকে বলে দিয়েছি। পায়েস করেছি আমি নিজে।
    বলে কেমন যেন মিচকি হেসে টুনি চলে গেল। আর আমি পুরো গঙ্গারাম বনে মনে মনে মানেবই হাতড়াতে থাকলাম।

মায়ের আশীর্বাদ কিনা কে জানে, পুজোতে অতি ভীতুর দলও হঠাৎ করে একেবারে দুঃসাহসী হয়ে যায়। অষ্টমীর রাতে আমাদের গ্রামের সেরা সুন্দরী শ্রীপর্ণাদির দিকে সবাই চোখ গোল গোল করে দেখছি। পুরো দুর্গা। আধখোলা চুল, সুন্দর করে আটপৌরে ভাবে পড়া শাড়ী, টানা টানা চোখ, ঠোঁটে মিষ্টি হাসি। পুরো একঘর! পিছন থেকে অনুপদা আওয়াজ দিল,
-বৌদি হয় তোদের। তাকাস না। দশমীতে গিয়ে প্রণাম করে আসবি।

  • আর তুমি কি প্রণাম নিতে যাবে?

একগাল হেসে অনুপদা চোখ মারল।
-না রে পাগলা। আমরা সমবয়সী কিনা। কোলাকুলি করে আসব।

সেই প্রাইমারী স্কুল থেকে অনুপদার শ্রীদির প্রতি একটা প্রচ্ছন্ন ব্যথা। আমরা সবাই জানি এক শ্রীদি ছাড়া। অন্ততঃ তখনও সেটাই ভাবতাম। আসলে শ্রীদিও জানত। অনুপদাকে খচিয়ে দিতে বললাম,
-তুমি আর কি কোলাকুলি করবে? সামনে গেলেই তো বোবা হয়ে যাও। আজ পর্যন্ত প্রপোজ করতে পারলে না। যাও মাঠে গিয়ে গরুর ঘাস কাটো। পারলে আজ প্রপোজ করে দেখাও।
আমাদের স্বনির্বাচিত প্রেমগুরুর আঁতে লেগে গেল।
-কি! আচ্ছা নিয়ে আয় গোলাপ। এক্ষুণি এই মাঠেই প্রপোজ করব।
-থাক। তোমার মুরোদ জানা আছে।

প্যান্ডেলের গায়ে অনেক গাঁদা ফুলের মালা ঝোলানো ছিল। তা থেকেই একটা গাঁদা ছিঁড়ে নিয়ে অনুপদা সোজা এগিয়ে গেল হন হন করে। গিয়ে শ্রীদির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে গেল পুরো মাঠের মাঝে। আমরা একেবারে ব্যোম। শ্রীদির মুখের ভাব পুরো দেখার মতো। এদিক ওদিক তাকিয়ে অনুপদার হাত থেকে গাঁদাটা নিল, তারপর তাড়াতাড়ি কি যেন বলল। অনুপদা উঠে চলে এলো। ঐদিকে শ্রীদির বান্ধবীরা সব হেসে লুটিয়ে যাচ্ছে এরওর গায়ে। অনুপদা কাছে আসতেই আমরা সব ছেঁকে ধরলাম।
-কি হল??

  • বললাম, “তোকে আমার খুব ভালোলাগে। আমায় বিয়ে করবি?”
  • অ্যাঁ!! সোজা বিয়ে!!
  • ধুর শালা। একে তো গলা শুকিয়ে গেছিল। তারপর ঐ রকম দেবী দেবী দেখাচ্ছে। সামনে গিয়ে সব গুলিয়ে গেল।
  • শ্রীদি কি বলল?
  • বলল, “যা এখান থেকে। পরে কথা বলব। মন্ডপে মা-বাবাও এসেছে।“
    আমাদের গলা থেকে পুরো হো-ও-ও-ও করে শব্দব্রহ্ম বের হল।
    -ত্রি চিয়ার্স ফর অনুপদা, হিপ হিপ হুররে এ এ ।

গোটা মাঠ আমাদের দেখছে। ছেলেপুলের দল অনুপদাকে কাধেঁ করে পুরো ভাসান নাচ শুরু করে দিয়েছে। বলাবাহুল্য সেইদিন সব ফুচকা, ভেলপুরির খরচ অনুপদাই দিল।
গতবছর শীতকালে শ্রীদি-অনুপদার বিয়েতে কব্জি ডুবিয়ে খেয়ে এলাম। মাস চারেক আগে শ্রীদি ফোন করে জানাল ওদের বাচ্চা হবে। ছোটবেলার প্রেমগুলো সাধারণত টিকতে দেখিনি। অদ্ভুত ব্যতিক্রম শ্রীদি-অনুপদা। দু’জনেই আমায় খুব ভালোবাসে। লকডাউনে ওরা এখন গ্রামের বাড়িতে। ওয়ার্ক ফ্রম হোম। আমাকে প্রতি সপ্তাহে হাজিরা দিতেই হয়। শ্রীদি ইউটিউব দেখে নতুন নতুন রান্না করছে আর আমি, অনুপদা হয়েছি গিনিপিগ। ওদের একসাথে দেখলে প্রেমে বিশ্বাস করতে বড় ইচ্ছে করে।
এইরে, আমি ধান ভাঙাতে চাল কলে গিয়ে মহাদেবের গাজন শুরু করেছি। আসলে অতীত ও স্মৃতি জিনিসগুলো এমনই, সবসময় মধুময় মনে হয়। আর পুজোর স্মৃতি সবার উপরে। আজকাল বড় হয়ে ওঠার সাথে সাথে পুজোর রূপ রস গন্ধগুলোও যেন হারিয়ে গেছে।
সেই রকম চারটে জামা হয় না। সেইরকম নদীর ধারে কাশফুল দেখে মন আনচান করে না। সেইরকম কর্মকারদের পাড়ায় ঠাকুর তৈরি দেখতে যাওয়ার তাড়াহুড়ো নেই। পুজো মানে আর পনেরদিন না, মেরে কেটে দু’দিনের ছুটি। নেই সেই প্যান্ডেলে বসা, ঝারিমারা
নেই আগমনী গান
নেই সাইকেল-বাইক নিয়ে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে টো টো করে ঘোরা
নেই সন্ধিপুজো, অঞ্জলি
নেই এক প্লেট ফুল চাউ তিনটে প্লেটে
নেই ঢাকের তালে নাচ
নেই দশমীর “দুগ্গামাই কি জয়”।
সব কেমন যেন হারিয়েগেছে। পড়ে রয়ে গেছে বড় পুকুরের ঢেউহীন জলের মত গভীর স্মৃতি। তার ওপরেও হালসিনি পড়েছে। এখন সেই স্মৃতি নাড়া পেলে মাঝে মধ্যে তরঙ্গ ওঠে। এমনও হতে পারে সবই এক আছে শুধু একবুক স্মৃতি নিয়ে আমিই গেছি বদলে।

“অতল বিষ সাগরে নিমজ্জিত
প্রশমনের অমৃতসন্ধান কে দিতে পারে?”

যে কিশোর অষ্টমীর সকালে মন্ডপে অঞ্জলী দিতে যায়নি তার জীবনের আঠারো আনাই মাটি। আমরা কোএডুকেশনের ছেলে না, বয়েজ স্কুলের পিলে। তাই বলছি, সদ্যস্নাতা নারীর এক সুগন্ধ আছে। আজকাল বডিস্প্রের ধাক্কায় প্রায় সব হারাতে বসেছে। সেই অষ্টমীর অঞ্জলীতে আশেপাশের ভিজে চুলের ঈশ্বরীদের গা থেকে ভেসে আসত এক সুন্দর ঐশ্বরীক সুবাস। নিজেকে ঐ সময় অমরাবতীর কিন্নর মনে করা যেতেই পারে। আশেপাশে শুধু কিন্নরীদের সমাবেশ। সবাই চোখ বুজে রূপং দেহি, যশো দেহি আওড়াচ্ছে। এদিকে আমাদের এক চোখ খোলা। বিড়াল তপস্বী সেজে যেন সকালের ফুলের বাগানে।
আহা!! এবার হাতের ফুলগুলি মায়ের পায়ে না পড়ে জ্যান্ত দেবীদের পায়ে সমর্পিত হলে আমাদের কি দোষ?
দেবী দর্শন হয়, সুন্দরী দর্শনও হয়, পুজো যেমন আসে হঠাৎ করে শেষও হয়ে যায়। দশমীর পুজো শেষে ঢাকে বোল বাজছে ‘মা থাকবে কতক্ষণ’। সকাল থেকেই মনটা খারাপ হতে থাকে। সন্ধ্যাতে সেই মণ্ডপে। সবাই শেষ বেলায় প্রণাম জানাচ্ছে। হঠাৎ সেই মেয়ে!! পাশের গ্রামের অপরিচিতা! কাপড়ের দোকানের সেই কিশোরী! শাড়ি পড়ে মায়ের সাথে।
কোথায় ছিল এতদিন?
সারা পুজো খুঁজেছি!
হালকা করে তাকিয়ে এগিয়ে গেল। ঢাক আর মণ্ডপে না, বুকের ভেতর বাজছে। চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লাম। বন্ধুরা বলল,
-কি হল?
-যাই, একবার শেষ প্রণামটা করে আসি।
এগোলাম মেয়েটার পিছে পিছে মণ্ডপের ভিতর। মেয়েটি একবার পিছনে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
কোন শালা বলে পুজো শেষ!!
আমার তো সবে শুরু হল….

“অগুনতি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী
রেখেছ ‘পুরুষ’ করে ‘সাবালক’ করনি।।“

Advertisement with GNE Bangla

একই রকমের খবর

Back to top button
Use GNE Bangla App Install Now
Subscribe YouTube Channel