জেলা

রীতি মেনেই আজও মেদিনীপুরের নন্দীবাড়ির পুজো করেন ওড়িশার ব্রাহ্মণ

পশ্চিম মেদিনীপুরে যে কয়েকটি পুরোনো
বনেদি বাড়ির পুজো হয় তার মধ্যে
উল্লেখযোগ্য একটি পুজো হল
নন্দীবাড়ির পুজো। মেদিনীপুরের
চিড়িমারসাইতে নন্দী জমিদার বাড়ির
এই পুজোর বয়স এখন প্রায় ৩০০। পুরোনো দিনের প্রথা মেনে আজও এখানে পুজো হয় ভিনরাজ্য ওড়িশা থেকে আসা
ব্রাহ্মণদের দিয়েই। পুজোর প্রথাও একটু
আলাদা।

ট্রাকে বা অন্য বাহনে নয়,
পুজো শেষে প্রতিমা বিসর্জন করে হয়
বেহারা সহ জমিদার পরিবারের
সদস্যদের কাঁধে চেপেই। সুদূর
কংসাবতীতে বিসর্জন দেওয়া হয়
প্রতিমা।

বর্ধমান জেলার বাসিন্দা রামকৃষ্ণ নন্দী
রোজগারের খোঁজে ওড়িশাতে পাড়ি
দিয়েছিলেন। সেখানে থেকেই তিনি
হয়ে উঠেছিলেন জমিদার। যথেষ্ট
প্রতিপত্তি হওয়ায় সেখানেই নিজেদের
বাড়িতে ঘটা করে দুর্গাপুজোর প্রচলন
করেছিলেন তিনি।

পরে প্রায় তিনশো বছর আগে মেদিনীপুর
শহরে চলে আসেন তাঁর ছেলে
রামগোবিন্দ নন্দী। পারসি ভাষায়
বিদ্বান রোমগোবিন্দের প্রভাব
প্রতিপত্তিও ছিল বেশ ভালো। ওকালতি
করে বিপুল অর্থের মালিক হয়ে
উঠেছিলেন তিনি। তাঁর বাসস্থান আজও
“নন্দী জমিদার বাড়ি” নামে পরিচিত।
বাড়ির পাশাপাশি এলাকাতেই বিশাল
বিশাল উঁচু থামওয়ালা অনেক মন্দির
নির্মাণ করেছিলেন তিনি। তাঁর নিজের
বাড়ির ভিতর ছিল দুর্গা পুজোর সুবিশাল
মণ্ডপ। বাইরে শিবমন্দির,
রাধাগোবিন্দের মন্দির।গত ৩০০ বছর আগে এই বাড়িতে দুর্গাপুজোর সব থেকে বড় আয়োজন ছিল।

সুবিশাল প্রতিমা বানিয়ে পুজো করানো
হত ওড়িশা থেকে আসা পাঁচজন
ব্রাহ্মণকে দিয়ে। পুজোর ক’টা দিন নন্দী
জমিদারদের সমস্ত পরিবারের সদস্যরা
একত্রিত হতেন। নিয়মানুসারে, এই
পরিবারের সদস্যরা পুজোর কোনও
কিছুতেই হাত লাগাতেন না। পুজোর
দিনগুলিতে প্রতিবেশী ও আগত
দর্শনার্থীদের আপ্যায়ন করাটাই ছিল
রীতি তাঁদের। পুজোর দিনগুলিতে প্রচুর
মানুষকে বসিয়ে খাওয়ানো ও দানের
রেওয়াজ ছিল।

মেদিনীপুর শহরের বক্সিবাজার,
চিড়িমারসাই, ভীমচকের বিপুল এলাকা
ছিল নন্দীদের জমিদারি। এই এলাকার
বাসিন্দারা সহ নন্দীদের প্রতিবেশীরা
সকলে মিলে একত্রিত হয়ে প্রতিমাকে
কাঁধে নিয়ে কংসাবতীতে বিসর্জন
দিতেন। সমস্ত কাজেই ছিল বনেদিয়ানা।
সেসব এখন অতীত। বিশাল সম্পত্তির
মালিক এই জমিদার পরিবারের সমস্ত
জমি এখন প্রতিবেশীদের দখলে। বাড়ির
সামনে থাকা বড়বড় মন্দিরগুলি এখন
ধ্বংস হতে বসেছে। নন্দীদের সপ্তম
বংশধরদের সুবিশাল একান্নবর্তী
পরিবার ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে
গিয়েছে। পুরোনো সম্পত্তি নিয়ে
বিবাদের জের পৌঁছেছে আদালত
পর্যন্ত। আদালতের নির্দেশে পরিবারের
এক একজন করে সম্পত্তি রক্ষার দায়িত্ব
পায়। বর্তমানে পুজোর দায়িত্ব রয়েছে
পরিবারের সদস্য তাপস নন্দীর হাতে।
তাপস নন্দীর কথায়, “সকলেই ছিন্নভিন্ন
হওয়ার সুযোগে ব্যবসায়ী থেকে
প্রতিবেশীরা আমাদের সম্পত্তি, দেবত্ব
সম্পত্তি সকলই দখল করতে শুরু করেছেন।

দেবত্ব সম্পত্তির আয় কমায় পুজোর
জৌলুস হারিয়েছে। মানুষকে বসিয়ে
খাওয়ানো, ঘটা করে সেই আয়োজন আর
হয় না। তবে কয়েক জন ভাই মিলে
পুরোনো ঐতিহ্যকে বজায় রাখার চেষ্টা
করি আমরা। নিজেদের যত্সামান্য আয়ের টাকাতে পুজোর আয়োজন হয়।

আজও ওড়িশা থেকে ব্রাহ্মণদের এনে রেখে পুজোর আয়োজন করি। প্রতিমা বিসর্জন হয় পুরোনো ৩০০ বছরের পুরোনো পদ্ধতিতেই। যতটুকু পারি দান ধ্যান করি।”

তবে জমিদার বাড়ির পুরোনো জৌলুস
নেই বলে দর্শনার্থীদের উপস্থিতিও কম।
তাহলেও দুর্গামূর্তি হয় বিশাল
আকারের। সাবেকিয়ানা ধরে রাখার
চেষ্টা করা হয়। তবে সম্পত্তি নিয়ে
গণ্ডগোলের জেরে মামলা, অশান্তি এই
জৌলুসকে ক্রমশই যেন শেষ করে দিচ্ছে।

Advertisement with GNE Bangla

একই রকমের খবর

Back to top button
Use GNE Bangla App Install Now
Subscribe YouTube Channel