বিশেষ সংখ্যা

ঐতিহ্য না অভিযোজন..আজকের নব্য সমাজে “শিকার” রীতি কতটা প্রাসঙ্গিক-জ্যোৎস্না সোরেন

✒️জ্যোৎস্না সোরেন:একদা গুহাবাসী মানুষ ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য “শিকার”করতো বনে জঙ্গলে, পাহাড়ে পর্বতে, নদীর তীরে, গিরি কন্দরে। সেদিনের গুহাবাসী মানুষের উত্তরসূরী আমরা, রূপান্তরিত সমাজ ব্যবস্থার আধুনিক সংস্করন৷

আজকের সমাজ ব্যবস্থায় ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য বোধহয় আর “শিকার” করতে হয় না৷ তবু কিসের টানে, হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ আদিবাসী মানুষ আজও জড়ো হন, মিলিত হন “আযোধিয়া বুরু বির সেন্দরা বা লবির সিতৗন টৗন্ডিতে শিকারের নামে।” নিছক ঐতিহ্য নাকি পরম্পরাকে ধরে রাখা, নাকি শিকারের নামে বন্যপ্রানী নিধন! কি বলছেন নেটিজেনরা ?
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে “শিকার” রীতি কতটা প্রাসঙ্গিক বা সময়োচিত?
এমন কি আছে যার জন্য দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ঐতিহ্যের পুনরুদ্ধারে নেমেছেন আজকের নব্য সমাজও?
অনেকে “শিকার” রীতিকে উৎসব বলতে নারাজ। তাঁদের মতে বন্য আদিমতার ঐতিহ্যকে মনে রেখে পশুনিধন পক্রিয়াকে উৎসব বলা চলে না। উৎসব কথার অর্থ উৎযাপন, আনন্দ প্রকাশের এক মাধ্যম।আভিধানিক অর্থ পুনরাগমন বা বার বার ফিরে আসা। “শিকার” রীতি না উৎসব এ দার্শনিক প্রশ্নের উত্তর তোলা রইল অন্য কোন দিনের জন্য।
ঐতিহ্য না অভিযোজন-কিসের টানে আজ আদিবাসী সাওতাঁল আবাল-বৃদ্ধ বনিত দের ঘর ছাড়া ওই জীবনে টানে?
ফিরে দেখার পিছু টানে দেখে নেওয়া যাক..

ঐতিহ্যবাহী “আযোধিয়া বুরু বির সেন্দরা” বা ল বির সিতান টৗন্ডিতে মৃগয়ায় যাওয়া প্রতিটি সাঁওতাল পুরুষের অন্তরের কথা। প্রত্যেকেই মনের মধ্যে লালন করেন জীবনে একবার সেই পূন্যভূমিতে পদার্পন করবেন জাতীয় অস্ত্র তীর ধনুক,টাঙ্গি বল্লম,লাঠি টাঙ্গি নিয়ে। আপনি যদি আদিবাসী পুরুষ হোন, আর যদি একবারও না গিয়ে থাকেন,বা যাওয়া র বাসনা মনে না পোষন করেন তবে জানবেন আপনি আদি ঘরানা থেকে অনেক খানি বিচ্যুত হয়েছেন। ধর্মপ্রান ইসলামদের মক্কা মদীনা, হিন্দুদের কাশীধাম, খ্রীষ্টানদের জেরুজালেম এবং আদিবাসী পুরুষদের আযোধিয়া বুরুবির সেন্দরা।

সেন্দরার আক্ষরিক অর্থ শিকার না বলে মৃগয়া বলা ভাল। কারন “শিকার” শব্দটা শুনলেই বাদী বিবাদীর মতো দুটো দৃশ্য চোখে ভাসে, শিকার আর শিকারী। ইংরেজী শব্দ, হান্ট আর হান্টারের প্রতিফলিত ভয়ার্ত রূপ। অন্যদিকে মৃগয়া শব্দে সৌখিনতার প্রলেপ জড়ানো। দুটোতেই যদিও বধ্য, আর ব্যাধের চিত্রায়ন, তবু মৃগয়া শব্দটি অনেকটা পেলব, শখের চারুকলার মতো। প্রাচীন রাজ পুরুষেরা ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য নয়, নিজেদের পৌরুষ প্রদর্শনের জন্যই মৃগয়ায় যেতেন। শখ করে দু চারটা বন্য শুয়োর, বন্য হরিনী, মেরে মৃগয়ার মাংস সদলবলে একসঙ্গে বন্য পরিবেশেই গ্রহন করতেন।আদিবাসীদের কাছে সেন্দরা করা মানে মৃগয়া করতে যাওয়া। আনন্দ উৎযাপনের লক্ষে একটা নির্দিষ্ট সময়ে সবাই মিলে মিলিত হওয়া।

বুদ্ধ পূর্নিমার দিন টাকে বেছে নেওয়ার একটা অর্থ পূর্ন দিক আছে। প্রথমত আরন্যক পরিবেশে সদ্য গজিয়ে ওঠা নূতন পাতায় বনভূমি সেজে ওঠে অপার্থিব৷ বন ফুলের সৌন্দর্য আর মনমাতানো গন্ধে মাতাল হৃদয় জ্যোৎস্নালোকিত পূর্নিমারাত্রে আত্মসন্ধান করে নিজেকে। কিসের আত্মানুসন্ধান? না, নিজের অস্তিত্বের, নিজ পৌরুষের, পুরুষকারের অনুসন্ধিৎসু হৃদয়ের উৎযাপন করা।

বুদ্ধ পূর্নিমা দিনটি অতীব শুভ দিন। এই দিনে সিদ্ধার্থ গৌতমী জন্ম গ্রহন করেছিলেন, বোধীত্ব লাভ করেছিলেন এবং মহানির্বান লাভ করেছিলেন। পৃথিবীর ইতিহাসে বিরলতম যা। অহিংসার পুজারী বৌদ্ধ দের কাছে দিনটি অতীব শুভ। বৌদ্ধদের যে অষ্টাঙ্গিক মার্গ আছে তার সঙ্গে আদি ঘরানার জীবন চরিতের ভীষন ভাবে সাদৃশ্য লক্ষিত হয়।
আবার আমরা যদি আদিবাসী সাঁওতালদের বেড়ে ওঠার পূর্ব ইতিহাস দেখি সেখানে নেপালের খাইবার গিরিপথ দিয়ে আমাদের পূর্বপুরুষেরা আফ্রিকা মহাদেশ থেকে ভারত বর্ষে পদার্পন করেছিলেন। আর নেপালেই বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশ হয়। পরবর্তী কালে যা দেশ দেশান্তে ছড়িয়ে পড়ে ৷বুদ্ধের জন্ম গ্রহনের অনেক আগে থেকেই আদি জীবনের সূচনা। সংস্কৃত বুদ্ধ কথার অর্থ যিনি শ্বাশ্বত বোধ বা জ্ঞান লাভ করেন। আদিবাসী মিথেও দেখা যায় আমাদের পরম পিতা যিনি শ্বাশ্বত জ্ঞানের অধিকারী, তোঁড়ে সুতৗম বা রেশম সুতো দিয়ে স্বর্গ থেকে মর্তে নেমেছিলেন মানুষের দুঃখ দুর্দশা নিরশনের জন্য।সেই দিনটা ছিল বৈশাখী কূনামী চান্দো মাহা বা বৈশাখী পূর্নিমার দিন। অর্থ্যাৎ একথা বলা যেতেই পারে বৈশাখী পূর্নিমার দিন সেই পবিত্র সিঞ বঙার পুরুষকার কে উৎযাপনের মাহাত্বকে স্মরন করেই এই বেছে নেওয়া হয়েছিল এই দিনটিকে।

সেন্দরা অর্থে অন্বেষন বা খোঁজ কাছাকাছি গেলেও বৃহৎ অর্থে শিকার বা মৃগয়া রীতিকেই প্রাধান্য দেওয়া যায়। এ বিষয়ে বলা যায় অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মতো আদিবাসী মাইথোলোজি , মিথ মৌখিক সাহিত্যের ওপর নির্ভরশীল। অপরাপর ঘটনাবলীর সাদৃশ্য বৈশাদৃশ্য,পরম্পরা, ঐতিহ্য ,ও লোকসাহিত্য ঘটনার আনুসঙ্গিকতা
বাস্তবতাকে প্রাধান্য দেয়।অাযোধিয়া অর্থ্যাৎ অযোধ্যা, বুরু অর্থে পাহাড় বা পর্বত,বির হলো অরন্য, সেন্দরা অর্থে শিকার। অর্থ্যাৎ আযোধিয়া বুরু বির সেন্দরার আক্ষরিক অর্থ করলে দাঁড়ায় অযোধ্যার অরন্য পর্বতে শিকার বা মৃগয়া করা। অযোধ্য কথার অর্থ যা যোধ্য নয়। অর্থ্যাৎ যুদ্ধে যা জয় করা যায় না, অপরাজেয়। অযোধ্যা অর্থে বীরভূমি। সূর্যবংশীয় রাজাদের বাসভূমি ছিল অযোধ্যা। প্রাচীন কোশল রাজাদের রাজধানী। পুরান সাহিত্যে দেখি অযোধ্যার অধিপতি ছিলেন দশরথ। তাঁরই সুযোগ্য পুত্র শ্রীরাম চন্দ্র। যাঁর হাতে ধনুর্ধর তির ধনুক শোভা পায়। আদিবাসীদের মিথ মাইথোলোজিতেও তির ধনুক আছে। আর আদিবাসী মাইথোলোজিতেও সিঞ বোঙার উপস্থিতি আমরা দেখি। সুতরাং আমরা যদি ঘটনার পুনর্নিমান করি তাহলে একথা সহজেই অনুমেয় আদিবাসীরা প্রাচীন জাতি। যেখানে তাঁরা বাস করতেন সেটা ছিল দেবভূমি এবং তাঁদের কে কেও সহজে যুদ্ধে পরাজিত করতে পারতেন না।তাঁদের উপাস্য দেবতা ছিলেন “সিঞ বঙা।” অর্থ্যাৎ সূর্য বঙা বা দেবতা। সিঞ বঙা থেকে সূর্য বঙা বা সুর্য বংশীয় শব্দ টা আসা অসম্ভব নয়। কারন প্রাচীন অষ্ট্রোললয়েড গোষ্ঠির অনেক শব্দই অপভ্রংসের মধ্য দিয়ে বাংলায় স্থান পেয়েছে।মহাভারতে কীরাত ভূমি বলা হয়েছে। সূর্যবংশীয় রাজারা নিজেদের অপরাজেয় প্রমান করতে প্রতিবছর যজ্ঞের ঘোড়া ছেড়ে দিতেন। সারা পৃথিবী ঘুরে এলে সেই ঘোড়াকে যজ্ঞে আত্মাহুতি দিয়ে অশ্বমেধ যজ্ঞ সম্পাদন করতেন এবং নিজেদের সসাগরা ধরিত্রীর অপরাজেয় ভেবে মৃগয়া বা শিকারে যেতেন।

বন্য পশু নিধন বা মারা নিছকই আনন্দ উৎযাপনের এক মাধ্যম। মৃগয়া শেষে রাজ পুরীতে ফিরলে তাঁদের পা ধূইয়ে দিয়ে তিলক পরিয়ে দিতেন রাজমাতা। প্রাচীন আদিবাসী লৌকিক জীবনেও দেখি আদিবাসী পুরুষেরা প্রতিবছর মৃগয়ায় যান নিজেদের বীরত্বকে প্রতিষ্ঠিত করতে। বন্য শ্বাপদ সংকুল পরিবেশ কে নিয়েদের অনুকূলে এনে নিজেদের বীরত্বকে প্রতিষ্ঠা করেন। মৃগয়া কালীন “আযোধিয়ৗ পাহাড়ের ওপরে ছোট টিলাকে গল বুরু” বলা হয়। তারই পাশে বয়ে চলা শিরশিরে ঝর্না হলো সীতানালা। কথিত চৌদ্দ বছর বনবাসে যাওয়ার সময় শ্রীরাম চন্দ্র, লক্ষ্মন,ও সীতাদেবী এখানে ক্ষনিক বিশ্রাম করেছিলেন। সীতাদেবী এই ঝর্নায় স্নান করেছিলেন, এবং গল বুরুতে অবস্থিত ” গুলাঞ বাহা,চাম্পা বাহা ,চাঁপা ফুল,গুলঞ্চ ফুল দিয়ে খোঁপা খানি যত্নে সাজিয়েছিলেন। সেই কাহিনীর সারবত্বা আছে কী নেই জানিনা। তবে আজও আদি পুরুষেরা প্রেয়সীর জন্য ফুলই নিয়ে আসে। আরও একটা মজার গল্প আছে “গল বূরু” বা শিষ পাহাড়ে শিষ দিলে তা প্রতিধ্বনিত হয়। চাঁপা গুলঞ্চ তলার উইঢিপিটা আপনি যদি এক নাগাড়ে শিষ দিয়ে তিন বার অতিক্রম করতে পারেন তবে নিজে থেকে ওপর থেকে ফুল পড়ে। সেই ফুল দিয়ে আপনার মনোকামনা পূর্ন হবেই।আপনারা যাঁরা যাবেন, নিশ্চয় ট্রাই করে দেখতে পারেন যদি সেই স্থানের সন্ধান পান।আদিবাসী লৌকিক প্রথা খুবই শৃঙ্খলাবদ্ধ। সেই লৌকিক প্রথার নয়া সংস্করন লোকআদালত আজও ল বির সিতান টান্ডি “তে বসে।পাহাড়ের পাদদেশে বসত ল বির বাইসি। বিচার সভা। সামাজিক রীতি নীতির কঠোর দিক যখন নিজ নিজ অঞ্চলে, গ্রামে ফয়সালা হতো না তখন গোটা দেশের মানুষের সামনে সেই বিচার সভা হতো। কথিত সেই প্রাচীন রীতির যে কঠোরতম দিক ল বির বাইসির অন্যতম ছিল তা হলো একই নারীর যদি একাধিক পুরুষ থাকতো এবং দুজনেই যদি তার পাণিপ্রার্থী হতো তখন সেই দুই পুরুষকে মল্লযুদ্ধে আহ্বান করা হতো।যে পুরুষ জিততো নারী তার। আর অপর পুরুষ কে বধ করতো সকলে মিলে সামাজিক রীতি লঙ্ঘন করার অপরাধে৷ ফল স্বরূপ,প্রাচীন রীতি লঙ্ঘনের সাহস হতো না। সেই প্রাচীন ভূমি পুত্ররা কতখানি দূরদর্শী ছিলেন ভাবতে অবাক লাগে।

মৃগয়া করতে যাওয়ার আগে নারী মুখ দর্শন ছিল নিষিদ্ধ। যাতে কোনো ভাবেই তারা মায়ায় পড়ে নিজ ধর্ম থেকে বিচ্যূত না হন। আজও এই সব প্রথা আদিবাসী লৌকিক জীবনে স্ব মহিমায় বর্তমান। সুতরাং বলা যেতে পারে আদিবাসী দের জীবন চরিতের লৌকিক প্রথা, নিছক ঐতিহ্য কে টিঁকিয়ে রাখা নয়, নয় অভিযোজনের নয়া রূপ। এ তো পরম্পরার মিসেলে জীবনকে ছুঁয়ে দেখার আত্মসম্মান কে প্রতিষ্ঠা করার এক অন্য অনূভূতি। তারই টানেই তো আদি পুরুষের বার বার ফিরে আসা, ছুঁতে চাওয়ার অদম্য আকাঙ্খা!

Tags
Advertisement with GNE Bangla

একই রকমের খবর

Back to top button
Close