বিশেষ সংখ্যাশিক্ষা ও স্বাস্থ্য

দারিদ্র্য ও দারিদ্র্য দূরীকরণ : এক সামাজিক অট্টহাস্য

✍️ শুভব্রত রানা:কিছুদিন আগেই ছিল আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য দূরীকরণ দিবস, ১৭ ই অক্টোবর। সকাল সকাল গন্যমান্য ব্যক্তিরা সব টুইট করলেন। তবে কতটা দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য আর কতটা খবরে থাকার জন্য সেটা গবেষনাযোগ্য। প্রকৃতই দারিদ্র্য দূর হলে গরিবের উপকার হলেও খবরে থাকা লোকজন যে ফেঁসে যাবেন। ন্যাঙলা প্যাঙলা গরিব গুর্বো মানুষগুলো এদের বহুমূল্য মূলধন। এদের ভাঙিয়ে করে খাচ্ছে। হঠাৎ করে এরা সব ভ্যানিশ হয়ে গেলে বড্ড গোলমাল। তাই সমস্যাকে ধামাচাপা দাও। কিন্তু খবরদার! সমস্যাকে খতম করবে না। সমস্যাকে বাঁচিয়ে রাখো, সময়ে অসময়ে ‘সুদ’ দেবে।
দিনটার নামকরণে আন্তর্জাতিক থাকলেও ‘গরিবি’ জিনিসটা আমাদের বড্ড আপন। এঁদো গলির এঁদো বাড়ির ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকা বাঙালির মতো, ঠিক আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠেনি। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের এবং আফ্রিকা মহাদেশের দেশগুলোর এর উপর আদি ও অকৃত্রিম অধিকার। অন্যদেরও আছে হয়তো কিন্তু আমাদের একদম বাপের সম্পত্তি। আমাদের বাপ ঠাকুরদা পেয়েছেন উত্তরাধিকারে তাঁদের ২০০ বছরের ইউরোপীয় প্রভুদের কাছ থেকে। ঐ প্রভুরা যারা চলে যাওয়ার সময় টাইয়ের ল্যাজ আর জুতো চাটার পরম্পরাও দিয়ে গেছে। যা অনুকরণ করেই আজকাল আমাদের বেশির ভাগের দিনগুজরান আর কি। লালামুখো বাবুরা মেরেছেন, ধরেছেন, কেটেছেন, লুঠ করেছেন, বেশ কয়েকটা মন্বন্তরও দিয়েছেন তারপর ভিখিরির মর্যাদায় আমাদের উত্তরণ ঘটিয়ে পরম্পরার ঐতিহ্যটা দিল্লি মসনদের যোগ্য উত্তরসূরিদের বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন। অবশেষে বিংশ শতাব্দীর শেষে পশ্চিমী মুক্তি সূর্য চোখ মেলেছে আর তারই ঠিকরে পড়া রশ্মি কনায় বাবুদের টনক নড়েছে।

১৯৯২ সালে ইউনাইটেড নেশনস সরকারি ভাবে ১৭ ই অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য দূরীকরণ দিবস হিসাবে ঘোষণা করেছে।

বিবেকানন্দ বলেছিলেন, যে নিজের মাকে ভাত দিতে পারে না সে মাকে কি করে দেখবে।

তাই নিজের দেশের কথাই আলোচনা করবো আজ। স্বাধীনতার এত বছর পরে অর্থনীতি আর বিজ্ঞানকে কেন্দ্র করে আমরা হু হু করে এগোচ্ছি। চারিদিকে ঝকঝকে শপিংমল, ঝাঁ চকচকে গাড়ি, ধবধবে উঁচু উঁচু বাড়ি, বৈভবের প্রদর্শনী। দেশ উন্নত হচ্ছে। হাজার হাজার কোটির মেট্রো রেল, লক্ষ কোটির অর্থনৈতিক বাজেট কিন্তু দিনদিন ধনতন্ত্র মরন কামড় শক্ত করছে আর ধনী গরিব বিভেদ স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে। কোটি কোটি মানুষ অপাংক্তেয় অবস্থায় তীব্র দারিদ্র্যকে সাথে নিয়ে বেঁচে আছে।

কিন্তু এই দারিদ্র্য জিনিসটা কি? শুধুই কি অর্থনৈতিক সমস্যা? মোটেই না। এটা আসলে অর্থনৈতিক সমস্যাকে কেন্দ্র করে উদ্ভুত একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। যেখানে নূন্যতম রোজগারের অভাবের সাথে জীবনের অতিসাধারণ চাহিদাপূরনের অপারগতা যুক্ত হয়ে আমাদের আপাত সিভিলাইজড সমাজের বুকের উপর দিগম্বরী তুর্কিনাচন নাচছে। দারিদ্র্যের হাত ধরে অনেকগুলি পারস্পরিক সম্পর্কীত সমস্যা হানা দিচ্ছে আর এই বিভীষিকার অন্যান্য রূপগুলো প্রকট হচ্ছে।
১। কাজের জায়গার ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি ও অব্যবস্থা
২। দুর্ঘটনা প্রবন ও অস্বাস্থ্যকর বাসস্থান
৩। পুষ্টিকর খাদ্যের অভাব
৪। রাজনৈতিক ক্ষমতার অভাব
৫। চিকিৎসা ব্যবস্থার অপ্রতুলতা
৬। বিচার ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকারে অসাম্য

এবার একটু তত্ত্বগত ভাবে বিচার করা যাক। আমাদের দেশ ক্রমবর্ধমান বাজার অর্থনীতির অন্তর্গত। টাকার অঙ্কের GDP র বিচারে ভারত হল পৃথিবীর ষষ্ঠ বৃহত্তম অর্থনীতি। কিন্তু IMF (International  Monetary Fund) এর ২০১৮ সালের বিশ্লেষণ অনুসারে GDP per capita র বিচারে ভারতের স্থান ১৩৯ তম।
এখন প্রশ্ন জাগে, GDP (Gross Domestic Product) জিনিসটা কি?
খুব সাধারণ ভাবে বললে, সারা দেশে একবছরে মোট উৎপাদিত জিনিসের মধ্যে যত টাকার জিনিস দেশের জনগণ ক্রয় করে তার মোট অঙ্ক।
GDP per Capita বলতে বোঝায়, দেশের GDP কে দেশের মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ অর্থাৎ দেশের একজন মানুষ এক বছরে(অর্থবর্ষে) মোট যত টাকার জিনিস কেনে।

ভারতের মোট GDP র পরিমান বর্তমানে আনুমানিক প্রায় ১৯০ লক্ষ কোটি টাকা। এই GDP র হার যত বৃদ্ধির দিকে থাকে ততই অর্থনীতির জন্য সুখবর হিসাবে ধরা হয়। ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ভারত ছিল পৃথিবীর প্রধান দ্রুত বৃদ্ধি সম্পন্ন অর্থনীতি। সেখানে এই বৃদ্ধির পর্যায়ক্রম
২০১৮-১৯ অর্থবর্ষতে ৬.১%,
২০১৯-২০ অর্থবর্ষে ৪.২%,
এবং অর্থনীতিবিদদের মতে ২০২০-২১ অর্থবর্ষে তা আরও কমে -১০.২% তে গিয়ে দাঁড়াবে। অর্থাৎ ভারতীয় অর্থনীতির ক্রমহ্রাসমান GDP সূচক নামতে নামতে ঋণাত্মক হতে চলেছে। অর্থনীতির মৃত্যু ঘন্টা যে বেজে গেছে তা বোঝার জন্য আর অর্থনীতিবিদ হওয়ার বোধ হয় প্রয়োজন হয়না। গত কয়েক বছরে GST প্রণয়ন, নোট বন্দি , সর্বোপরি গোদের উপর বিষফোঁড়া করোনা পরিস্থিতি ও লকডাউন কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দিয়েছে।

ভারতের মোট জনসংখ্যা অনুমিত হয় প্রায় ১৩০ কোটি যার একটি প্রধান অংশ অসংগঠিত ক্ষেত্রে উপার্জনে নিয়োজিত। আর বিধ্বংসী লকডাউনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এরাই। ফলে সমাজের অর্থনৈতিক বিভেদটা আরও প্রকট হয়েছে। এই বিভেদের তারতম্য একটু পরিসংখ্যান বিশ্লেষনেই বোঝা যাবে।
IMF এর বিশ্লেষণে ২০২০-২১ অর্থবর্ষে GST(Nominal) per Capita আনুমানিক প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি তার নিত্য প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে সারা বছরে প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার টাকা খরচ করে।
এখন পরিসংখ্যান বাদ দিয়ে সাধারণ ভাবে দেখলে, আমাদের গ্রামের একজন ব্যক্তির সারা বছরের আনুমানিক মোট আয় অনেক ক্ষেত্রেই বহু কম। এমনকি IMF এর বিচারে একজনের বছরের মোট খরচের আশেপাশেও নয়। তাহলে সে ঐ টাকা খরচ করবে কি করে?
তারমানে গন্ডগোল! বিস্তর গন্ডগোল!
মোট GDP তে শহর গ্রামের বিভেদটাও স্পষ্ট। শহরাঞ্চলে যেখানে ভারতের মোট জনসংখ্যার মাত্র এক তৃতীয়াংশেরও কম লোক বসবাস করেন সেখানে মোট GDP র দুই তৃতীয়াংশ শহরাঞ্চলের অধীন।
আমাদের অর্থনীতির মূল স্তম্ভ কৃষি, একথা সোচ্চারে বারবার ঘোষিত হয়। কিন্তু মোট GDP র মাত্র ১৫.৪% কৃষির অধীন। যেখানে ভারতের মোট শ্রমজীবির ৪৪% মানুষ সরাসরি কৃষিকাজের সাথে যুক্ত।

বিভেদের গ্যাড়াকলটা এবার বোধহয় স্পষ্ট হচ্ছে।
অর্থনীতির দৈন্যদশা যত প্রকট হচ্ছে, অর্থনৈতিক নীতিবাগীশের দল ততই নন্দঘোষের জায়গা করোনাকে দিচ্ছেন। এমন একটা অবস্হা সৃষ্টি হয়েছে যেন মনে হচ্ছে করোনাই প্রধান ভিলেন আগে সব ঠিক ছিল।

২০১৯ এর এক রিপোর্ট অনুযায়ী RBI এর পর্যবেক্ষণে, ভারতের গ্রামীণ এলাকার ২৫.৭% লোক দারিদ্রসীমার নীচে বাস করেন। শহরাঞ্চলে সেটা ১৩.৭%। সব মিলিয়ে মোট জনসংখ্যার ২২% মানুষ দারিদ্র্যসীমার নীচে। ছত্তিশগড় ও ঝাড়খণ্ডের গ্রামীন এলাকার অবস্থাটা সবচেয়ে সঙ্গীন, ৪৫% লোক দারিদ্র্যসীমার নীচে।

তাহলে করোনা বোধহয় পুরোটা দায়ী নয়।
লকডাউনের শেষে এসে এখন বাজারে চাহিদা অর্থনৈতিক কারণেই কম। উৎপাদন সেক্টরগুলি সবে কাজ শুরু করেছে। মূল্যবৃদ্ধি ও ক্রমহ্রাসমান চাহিদার কারনে বাজার যখন ধুঁকছে তখন অন্যদিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে শেয়ার বাজার চাঙ্গা। রোজ লক্ষ কোটি টাকা এদিক ওদিক হচ্ছে। অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে এক শ্রেণীর মানুষের হাতে প্রচুর উদ্বৃত্ত অর্থ সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। উৎপাদন বাজারে মন্দার কারনে লাভের জন্য তাঁরা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগে ব্যস্ত। তাই উৎপাদন বাজার শেয়ার বাজারের নিয়ন্ত্রক হলেও বর্তমানে সেই সূত্র কাজ করছে না। যা অর্থনীতির বিপদেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

একটু ব্যবহারিক ভাবে বিশ্লেষণ করা যাক। এখন আমাদের গ্রামের বাজারে খুচরো আলু কেজি প্রতি ৩০ টাকা থেকে ৩৫ টাকাতে বিকোচ্ছে। আর বছরের শুরুতে যখন আলু গুদামজাত হয়েছিল তখন কত টাকায় বিক্রি করেছিলেন একটু দেখুন। ফারাকটা দেখতে পেলে ভাবুন সেই মাত্রাতিরিক্ত অঙ্কের টাকা কোথায় যাচ্ছে। আর বর্তমানে বাজারের অনিয়ন্ত্রিত অবস্থার পিছনে কোন ‘করোনা’ দায়ী সেটা বুঝে নিন।
International Labour Organization(ILO) র বিশ্লেষণে ২০২০ অর্থবর্ষে বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়ে ৫.৪% হতে চলেছে এবং যুব বেকারত্ব হতে চলেছে প্রায় ২৩.৮%।
ইতিমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে আন্তর্জাতিক ক্ষুধা সূচক (Global Hunger Index) ২০২০। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী ভারতের মান ক্রমশ নীচে নেমেছে। ২০১৫-১৯ এর তথ্য বিশ্লেষণ করে, ভারতের স্থান ৯৪ নম্বরে মোট ১০৭ টি দেশের মধ্যে। এমনকি আমাদের অবস্থান বাংলাদেশ(৭৫) এবং পাকিস্তানেরও(৮৮) নিচে। Concern Worldwide & Welthungerhilfe গত ১৬ ই অক্টোবর এই রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, দারিদ্র্য দূরীকরণ দিবসের আগের দিন। আশ্চর্য সমাপতন!
মোট অর্থনীতি বাড়বে, বাজারও বাড়বে। আরও প্রকট হবে অর্থনৈতিক বিভেদ। সমাজের দৈনন্দিন প্রাথমিক চাহিদা – খাদ্যের যিনি জোগান দেন সেই চাষি পৌঁছে যাচ্ছেন দারিদ্র্যের শেষ সীমায়। অসংগঠিত ক্ষেত্রের কোটি কোটি কর্মচারী কর্মহীন। শিক্ষিত বেকার বাড়ছে, পেটের ক্ষিধেও বাড়ছে।


তথ্যসূত্র :

  1. A socially distant poverty line, The Hindu, by Sarah Iype Dated June 21, 2020
  2. United Nations Website,
    https://www.un.org/en/observances/day-for-eradicating-poverty
  3. “World Economic Outlook Database, October 2019” IMF, retrieved 15 October, 2019
  4. https://www.imf.org/external/pubs/ft/weo/2019/01/weodata/weorept.aspx?pr.x=87&pr.y=17&sy=2013&ey=2023&scsm=1&ssd=1&sort=country&ds=.&br=1&c=924%2C534&s=NGDP_RPCH&grp=0&a=
    IMF, retrieved 7 July, 2019
  5. “World Economic Outlook Database, October 2020” , IMF
    Retrieved 17th October, 2020
  6. “Labor Force by Services”, World Bank, Retrieved 27 January, 2019
    Labour force by Industry & Agriculture
  7. “Unemployment, total (% of total labor force) (modeled ILO estimate) – India” , World Bank,
    Retrieved 22 nd September, 2020
  8. “Unemployment, youth total (% of total labor force ages 15–24) (modeled ILO estimate) – India”
    World Bank,
    retrieved 22nd September, 2020
  9. “Global Economic Prospects, June 2020”, World Bank, p. 98,
    Retrieved 21 June, 2020
  10. “Global outlook less pessimistic, but risks and uncertainty remain high, September 2020”
    OECD, Retrieved 21 September, 2020
  11. Around 22% Indians live below poverty line; Chhattisgarh, Jharkhand fare worst,
    Financial Express, by Samrat Sharma Dated Sep 21, 2019
  12. India fares poorly in hunger index
    The Hindu, by Special Correspondence
    Dated October 17, 2020
  13. Wikipedia
  14. “Global Hunger Index 2020: India ranks 94 out of 107 countries, under ‘serious’ category”
    The Indian Express,
    Dated October 16, 2020

Advertisement with GNE Bangla

একই রকমের খবর

Back to top button
Use GNE Bangla App Install Now
Subscribe YouTube Channel