রাজ্যবিশেষ সংখ্যা
Trending

“মকর সংক্রান্তি উৎসব”-বুবুল মাহাত

“কার্তিকে দীপান্বিতা কালিপূজার দিনে,
ইতুপূজা, কুরুইচণ্ডী আসে অগ্রহায়ণে ৷
পৌষের শীতে নবান্ন নলেন গুড় আর ধানে,সংক্রান্তিতে পিঠে পার্বণ আর মকর স্নানে ৷৷”

পৌষ মাসের শেষ দিনে পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি পালন করা হয় ৷ এই সময় নতুন ধান ওঠে ,বাংলার ঘরে ঘরে পালন করা হয় পিঠে পার্বন৷ এই সময় সূর্যের দক্ষিণায়ন শেষ হয়ে উত্তরায়ণ শুরু হয় ৷সূর্য এই দিনেই মকর রাশিতে প্রবেশ করে, সেই কারনেই দিন টি মকর সংক্রান্তি ৷উত্তরায়নের ফলে উত্তর গোলার্ধে দিন ক্রমশ বড় ও রাত ছোট হতে থাকে ৷

জীবনের রাত্রিরূপি সকল অসভ্য, অহঙ্কার, অজ্ঞানতা ও জড়ত্ব থেকে মুক্তি লাভের চিরকাল আকাঙ্খা — অসতো মা সদগময়, তমসো মা জ্যোতির্গময় ৷ মৃত্যোর্মা অমৃতংগময়— আমাকে অসৎ থেকে সৎ পথে নিয়ে এস, অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে চল, মৃত্যু থেকে অমৃতের পথ দেখাও ৷অলস শীতের দীর্ঘ অবসানে এ যেন নব আনন্দে জেগে ওঠা ৷
এই মকর সংক্রান্তির দিনে মকরবাহিনী গঙ্গায় ও পূণ্য সলিলা নদ-নদীতে স্নান** করেন হিন্দু নরানারী ৷ আজ পৌষ পার্বণ তিল সংক্রান্তি ৷ স্নেহপূর্ণ তিল ও গুড়ের মিষ্টির পাকে জমাট বাঁধা নাডু যেন স্নেহের বন্ধনে আবদ্ধ এক সংগঠিত শক্তিশালী জাতি গঠনেয় ইঙ্গিত দেয় ৷

মকর স্নানের এক পৌরানিক কাহানি আছে ,– কপিলমুনি বিষ্ণু অবতার, তাঁর রোষে সৃষ্টি ধ্বংস হতে বসেছিল ৷ ইস্বাকু বংশীয় রাজা সাগর ছিলেন সমৃদ্ধশালী রাজা | নাগরিকদের উন্নতির মাধ্যমে হৃদয় জয় করা ছিল তার রাজধর্ম ৷ জনহীতকারি সগর রাজা তাঁর সাম্রাজ্যবাসীর নৈতিক ও মানসিক উন্নতি ঘটানোর জন্য, .জনকল্যানণকারী সম্রাট হিসাবে গণ্য হয়েছিলেন৷ দেবলোক প্রাপ্ত করার জন্য সগর রাজার ইচ্ছা হল, অশ্বমেধ যজ্ঞ করবেন ৷ যঞ্জের ঘোড়া বিভিন্ন এলাকায় পরিক্রমা করে ৷ এমন সময় ঘোড়া ইন্দ্রের রাজসভার কাছে এলে ইন্দ্র ঘোড়াটি কে অপহরন করে কপিলমুনি আশ্রমের পাশে বেঁধে রাখেন ৷ সাগর রাজার ছেলেরা চারিদিকে খুঁজাখুঁজির পর এক সময় সাগর পুত্র অংশুমান কপিলমুনির আশ্রমের কাছে ঘোড়াটি দেখতে পেয়ে কপিলমুনিকে ভন্ড চোর মনেকরে মুনির ধ্যানভঙ্গ করান | মিথ্যা অপবাদ দেওয়ায় কপিলমুনির রাগে সগর রাজার ষাট হাজার সন্তান ভষ্মীভূত হয়ে যায়৷

অবশেষে সাগর রাজার পৌত্র ভগীরথের দীর্ঘ দুঃসাধ্য প্রচেষ্টায় কপিলমুনি শান্ত হলেন ৷কপিলমুনি ভগীরথকে বললেন একমাত্র গঙ্গার পূণ্য সলিলেই ভগীরথের পূর্বপুরুষরা মুক্তি পাবে এবং দেশ পুনরুজীত হবে ৷ ভগীরথের কটোর তপস্যা এবং একাগ্রতায় সন্তুষ্ট হয়ে গঙ্গাধারা মর্তে সিঞ্চনে সগর রাজার পুত্ররা জীবিত হয় I প্রভাবিত এলাকা উর্বরা শস্যশ্যামলা হয় ৷ গঙ্গার পুণ্য সলিলে ভগীরথ পূর্বপূরুষ সগর রাজার পুত্ররা জীবিত, প্রবাহিত পূণ্য তিথিতে সারা দেশে মকর সংক্রান্তি পালিত হয় |

মকর সংক্রান্তি উৎসব দেশের সঙ্গে সঙ্গে বিদেশেও পালন করা হয় , বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ায় এই দিবস বা ক্ষণকে ঘিরে উদযাপিত হয় উৎসব। নেপালে এই দিবসটি মাঘি নামে, থাইল্যান্ডে সংক্রান, লাওসে পি মা লাও, মিয়ানমারে থিং ইয়ান এবং কম্বোডিয়ায় মহাসংক্রান নামে উদযাপিত হয়। অবশ্যিকভাবে দেশ ভেদে এর নামের মতোই উৎসবের ধরণে থাকে পার্থক্য।

ভারতের উত্তর এবং পশ্চিম প্রদেশগুলোতে উৎসবটি
প্রবল আগ্রহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে সংক্রান্তি দিবস হিসেবে পালিত হয়। প্রাচীন মহাকাব্য মহাভারতেও এই দিনের তাৎপর্য সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে। তাই সামাজিক এবং ভৌগোলিক গুরুত্ব ছাড়াও এই দিনটি ঐতিহাসিক এবং ধর্মীয় গুরুত্ব বহন করে।
পশ্চিম ভারতীয় প্রদেশ গুজরাটে উৎসবটি ঘুড়ি উৎসব নামে, যা মূলত প্রিয় দেবতার কাছে পৌঁছানোর জন্য একটি রূপক বা প্রতীক হিসেবে কাজ করে। মকরসংক্রান্তি সম্মান, অভিলাষ এবং জ্ঞানের দেবী সরস্বতীকে সম্মান প্রদানের মাধ্যমেও প্রকাশিত হয়। মহারাষ্ট্রে একে বলা হয় ‘তিলগুল’। কর্ণাটকে একে বলা হয় ‘ইল্লু বিল্লা’।অসমে ভোগারি বিহু I পাঞ্জাব-হরিয়ানাতে লোহরী৷ কাশ্মীরে শায়েত-ক্রাত ৷মধ্যপ্রদেশ-ছত্রিশগড়ে সুকরাত ৷ তামিলনাড়ু-কেরলে পোঙ্গল I গ্রাম বাংলায় নতুন ফসল ঘরে তোলার পর ধানের শীষ দিয়ে বিনুনী করে ঘরের দরজায় দেওয়া হয় — আউনি-বাউনি ৷
বাংলাতে টুসু পরব বা মকর পরব বলা হয় (টুসুর নামকরণ সম্বন্ধে সর্বজনগ্রাহ্য কোন মত নেই। ডঃ বঙ্কিমচন্দ্র মাহাতোর মতে, তুষ থেকে টুসু শব্দটি এসেছে। দীনেন্দ্রনাথ সরকারের মতে তিষ্যা বা পুষ্যা নক্ষত্র থেকে অথবা উষা থেকে টুসু শব্দটি এসেছে, আবার কখনো তিনি বলেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের প্রজনের দেবতা টেষুব থেকে টুসু শব্দটি তৈরী হয়েছে)।
বাংলাতে পবিত্র সৌভাগ্যের প্রতীক সারা বছর যেন শস্য উৎপাদন ও শস্য পূর্ণ অব্যাহত রাখার জন্য নতুন গুড় ও তিল দিয়ে তিলকূট, নতুন চালের খিচুড়ি বাস্তুপুরুষদের উদ্দেশ্যে নিবেদন করেন ৷ এই নিবেদনে বিভিন্ন প্রকারের পিঠে প্রস্তুত করার প্রচলন রয়েছে ৷

মকর সংক্রান্তির দিনেই বীরভূমের কেন্দুলী গ্রামে ঐতিহ্যময় জয়দেব মেলা হয়৷ মহাভারতের পিতামহ ভীষ্ম তাঁর ইচ্ছামৃত্যুর জন্য এই পবিত্র দিনটিকেই বেছে নিয়েছিলেন ৷ এই পবিত্র দিনেই জন্মগ্রহন করেন গুরু গোবিন্দ সিংহ, স্বামী বিবেকানন্দ I শ্রীগুরুজী এই পবিত্র দিনেই সারগাছি আশ্রমেই স্বামী অখণ্ডানন্দের কাছে দীক্ষা গ্রহন করেন ৷ 1938 সালের এই দিনেই উদ্বোধন হয়েছিল বেলুড় মঠের I একাত্মতার আহানে লক্ষ লক্ষ মানুষ এদিন ছুটে আসেন গঙ্গাসাগরে পূণ্য স্নানের জন্য৷

Advertisement with GNE Bangla

একই রকমের খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
Use GNE Bangla App Install Now
Subscribe YouTube Channel